*******
ফ্ল্যাটের তিনতলার ব্যালকনির একেবারে সামনে একটা কদমগাছ।
বিকেল নামতেই হাজার হাজার পাখি এসে বসে গাছের ছায়ায়। কল-কাকলিতে মানুষের কন্ঠস্বর,
সাইকেল, রিকশার শব্দ সব কিছু ঢেকে জায় এই সময়টায়। প্রায় তিরিশ-চল্লিশ মিনিট একটানা
চলতে থাকে এই কান্ড। মনে হয়, যেন পৃথিবীর সমস্ত পাখি এই গাছে এসে তাদের সারাদিনের
গল্প বিনিময় করে পরস্পরের সঙ্গে। এত ভাল লাগে এই সময়টা। মাধবীরও খুব ইচ্ছা করে
ওদের সঙ্গে কথা বলতে। ইশ, পাখিদের ভাষাটা যদি শোনা যেত, তা হলে ওদের সারাদিনের
অভিজ্ঞতা, কত উড়ান, কত-কত কিছু যে জানা যেত! আর তারপর নিজের কথা বলেও বেশ খানিকটা
হালকা হওয়া যেত। অনেক, অনেক কথা গোটা শরীর জুড়ে। এতগুলো বছর ধরে জমানো, পাহাড় হয়ে
ওঠা কথা শোনার মত কেউ নেই। সবাই যে যার মত ব্যস্ত। ভাবতে-ভাবতেই মোবাইল বেজে উঠল।
ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে এল মাধবী। এই সময়টায় রোজ পাপিয়া ফোন করে।
“হ্যালো।”
“হুম, কি করছ?” ওদিক থেকে
জিজ্ঞেস করল পাপিয়া।
“এই তো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলাম।”
“পাখি সব করে রব থেমেছে?”
“হ্যাঁ”- বলে হাসল মাধবী।
“গা ধোওয়া হয়ে গিয়েছে?”
“না, এই যাব এবার। আজ সারা
দুপুর কারেন্ট ছিল না। এই একটু আগে এসেছে।”
“ওহ! দুপুরে কি খেলে আজ?”
“ওই তো মুগডাল সেদ্ধ
দিয়েছিলাম, পোস্তর বড়া আর আলু-পটলের তরকারি।”
“কেন, মাছ খাওনি?”
“না, আজ ভাল লাগছিল না।”
“এই তো তোমার বাজে স্বভাব। কেন
খাওনি? তুমি না! রাতে খাবে কিন্তু বলে রাখলাম।”
“আচ্ছা রে বাবা ঠিক আছে।”
“ওষুধ?”
“হ্যাঁ, তুই কখন বের হবি?”
“দেখি,” বলে একটু চুপ থাকে
পাপিয়া। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “কেউ এসেছিল?”
“না তো, কে আসবে আবার?”
“না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
আচ্ছা রাখছি।”
*******
মা যে এতগুলো বছর ধরে সারাদিন কি ভাবে বুঝতে পারে না
পাপিয়া। বাবা যখন মারা জায়, পাপিয়া তখন ক্লাস সেভেন। নামকরা একটা কন্সট্রাক্সন
কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিল অনীক মিত্র, পাপিয়ার বাবা। একটা আন্ডারকন্সট্রাক্সন
বিল্ডিঙের ফিফথ ফ্লোর থেকে পড়ে গেছিল। এখনও চোখ বুঝলেই মাঝেমধ্যে পাপিয়ার মাথার
ভিতর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেদিনের দৃশ্যগুলো। এতগুলো বছর পরেও এতটুকু হলদে হয়নি সে দিনের
স্মৃতি। বাবা কি পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল, না ইচ্ছা করে? কানাঘুষোতে পরে অনেক কিছু
শুনেছিল পাপিয়া। প্রশ্নগুলো বিষ পিঁপড়ের মত বছরের পর বছর কামড়েছে পাপিয়াকে। কিন্তু
উত্তর পায়নি।তবে বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে পলাশকাকুর এই বাড়ীতে আসাযাওয়া
টা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বাবার ছোটোবেলার বন্ধু ছিল। পাশের পাড়ায় বাড়ী। ব্যাঙ্কে
চাকরি করে। বিয়ে-থা করেনি। কেন করেনি, জানে না পাপিয়া। ও যখন ক্লাস সিক্স, বাবা
পলাশকাকুকে ঠিক করে দিয়েছিল, পাপিয়াকে অঙ্ক শেখানোর জন্য। জখন-তখন অঙ্ক করাতে চলে
আসতো কাকু। তবে অঙ্কের চেয়ে মায়ের সঙ্গে গল্প করতেই যে লোকটা ভালোবাসতো বেশী, সেটা
বুঝতো পাপিয়া। পলাশকাকুর কথায় খুব হাসত মা। বাবা মারা যাওয়ার ৬-৭ মাস পর থেকে মা
যেন কাকুর কথায় আগের চেয়েও বেশি-বেশি হাসত। এমনকি, কাকুর বোকা বোকা জোকস শুনেও
হি-হি করে গড়িয়ে পড়ত প্রায়। সত্যিই কি মা’র এত হাসি পেতো?
আজ পাপিয়ার ডে-অফ। বিকেলে দীপের সঙ্গে দেখা করার আছে। গতকাল
রাতে ফোন করেছিল দীপ। কি যেন একটা গিফট কিনেছে পাপিয়ার জন্য। কি গিফট বলেনি। ওটাই
নাকি সারপ্রাইজ। ছেলেটা সারাক্ষন নিজের খেয়ালেই থাকে। চাকরি-বাকরি কোনোদিন করবে
বলে মনে হয় না। শুধু টিউশনে আর কি বা হয়? বিয়ের পর সংসার যে পাপিয়াকেই টানতে হবে,
সেটা দুজনেই জানে। জাক গে, ছেলেটা তো ভালো। মনটা একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল
পাপিয়ার। কলিংবেলের শব্দ হল। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো ও। বেলা এগারোটায়
আবার কে এল?
দরজা খুলল মা। “ও বাবা তুমি
এখন?”মা’র গলায় চাপা উচ্ছাস। নিজের ঘরে বসে শুনতে পেল পাপিয়া।
“হ্যাঁ, চলে এলাম। পাপিয়া
আছে?”
“হ্যাঁ, আছে তো।”
“কই?”
“ওর নিজের ঘরে। যাও।”
পলাশকাকু এসেছে। কিন্তু এই
সময় কেন? ম্যাগাজিনটায় প্রায় মুখ ডুবিয়ে ফেলল পাপিয়া।
“কি রে, কি করছিস?” ঘরে
ঢুকে পাপিয়ার একপাশে বিছানায় ঝপ করে বসে পড়ল পলাশ।
“ও তুমি! কখন এলে?”
“এই তো এখনই। তারপর
অফিস-টফিস কেমন চলছে বল?”
“চলছে মোটামুটি।”
“শোন, এখন ঝট করে
চেঞ্জ-টেঞ্জ করিস না। আগে এক্সপিরিয়েন্স টা করে নে। তারপর বাইরে কোথাও বেটার অপারচুনিটি
পেলে চলে যাবি।”
“কেন? হঠাৎ বাইরে যাবো
কেন?” ম্যাগাজিন থেকে মুখ সরিয়ে সটান পলাশের দিকে তাকাল পাপিয়া।
“না মানে,” সামান্য ঢোক
গিলল পলাশ, “এখন তো দেখি প্রায় সব ভালো ছেলেমেয়েরাই স্টেটের বাইরে চলে যায়”, ছোট
ভুঁড়িটা দুলিয়ে হাসল পলাশ। হাসিটা একঝলক দেখে নিয়ে আবার ম্যাগাজিনে চোখ রাখল
পাপিয়া।
“না তুই পড়, আমি উঠি।”
“আচ্ছা।”
পলাশ ঘর ছেড়ে বেরিয়েই হাঁক
পাড়লো, “মাধবী কই গেলে? আমি চললাম।”
রান্নাঘর থেকে মা সাড়া দিল,
“একটু বসে যাও, চা বসিয়েছি।”
“অ বসিয়ে ফেলেছো?তা হলে তো
বসতেই হয়, হে হে,” বলে পলাশ ড্রয়িংরুমের সোফায় ধপাস করে বসে সেন্টার টেবিল থেকে
রিমোট নিয়ে টিভি অন করল।
নিজের ঘরে বসেই ম্যাগাজিনের
আড়াল দিয়ে দেখল পাপিয়া। লোকটাকে কেন যে এত অসহ্য লাগে!!
*******
বিকেলে বিটি রোড ধরে
হাঁটছিল পাপিয়া আর দীপ। পাপিয়া দীপের সাইকেলের দিকে আঙুল তুলে বলল, “এবার প্লিজ
তোমার এই ঝরঝরে মালটাকে ফেলবে?”
“বেচারার বয়স হয়েছে বলে যা
খুশী তাই বলাটা ঠিক নয়।”
“তা হলে একটু সার্ভিসিং
করিয়ে নাও। কি বিচ্ছিরি শব্দ হয়, ইস!”
“হুম, এবার করে ফেলব। আজ
একটা ভালো টিউশন পেয়েছি। ছাত্রের বাবা বিশাল মালদার। একমাত্র ছেলে ক্লাস এইটে ফেল
করেছে। শুধু সায়েন্স গ্রুপ পড়াতে হবে। সপ্তাহে তিনদিন, আটশো দেবে।”
“ফেল করা ছাত্রও পড়াচ্ছো
আজকাল!” ভুরু কুঁচকে তাকালো পাপিয়া।
“উপায় কি? খাতায় একবার নাম
লিখিয়ে ফেলিছি যখন, আর কি সকাল-বিকেল পূর্ণিমা-অমাবস্যা দেখলে হবে?”
“খাতা? কিসের খাতা?”
“এই রে, না-না কিছু না,”জিভ
কাটল দীপ।
“কি যে বলো সব। অর্ধেক বুঝি
না।”
“যাক গে, বাদ দাও, বাচ্চা
মেয়ে অত বুঝে কাজ নেই,”বলে মুচকি হাসল দীপ।
“হুম, আমি বাচ্চা? লজ্জা
করে না তোমার বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে?”
“হ্যাঁ, করে তো। সেই জন্যই
দেখো না কিরকম লজ্জা পেয়ে থাকি তোমার কাছে!”
“একটা থাপ্পড় মারবো। বাঁদর
ছেলে কোথাকার! ফর্মটা তুলেছিলে?”
“কোন ফর্ম? ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ,
এস বি আই পিও তো? কবে তুলে নিয়েছি। ফিলাপও হয়ে গিয়েছে। শুধু ওই ডি ডি টা বানানো
বাকি। মাইরি, দু’শো টাকা হেব্বি গায়ে লাগছে।”
“ঠিক আছে, আমি দিয়ে দেবো।
আপনি শুধু দয়া করে ফর্মটা জমা করুন।”
“আরে, না না, তুমি কেন
দেবে? আমি এমনিই বললাম। এই সপ্তাহেই জমা করে দেবো।”
“এই সপ্তাহেই জমা করবে?
আচ্ছা, লাস্ট ডেট কবে জমা দেওয়ার?”
“এই তো, এই উইকেই,”
স্মার্টলি বলল দীপ।
“উফ, ভগবান বেছে বেছে কেন
যে আমার কপালেই এমন একটা অপদার্থকে জোটাল!” কপালে হাত রেখে বলল পাপিয়া।
“কেন আমি আবার কি করলাম?”
“ফর্মটা জমা দেওয়ার লাস্ট
ডেট আগামীকাল। তুমি ভুলে গিয়েছো, অথচ আমার মনে রয়েছে, আশ্চর্য!”
“আরে কি মুশকিল, আগামীকাল
তো এই সপ্তাহের ভিতরেই পড়ে, নাকি?”
“প্লিজ, আমাকে আর টুপি পরিও
না। দয়া করে কাল জমাটা দিয়ো, কৃতার্থ হব। আর প্রিপারেশন নিচ্ছ কিছু? নাকি
শুধুই...”
“ওরে বাবা, এবার ছাড়ো না
এসব কথা,” অধৈর্য হয়ে বলল দীপ। “একে তো সপ্তাহে এইটুকু সময় দেখা হয়, সেইটুকু
টাইমেও যদি তুমি দিদিমণিগিরি করো, তাহলে আর কথা বলব কখন?”
“ও তা-ই? বেশ এবার থেকে আর
কোনওদিন কিচ্ছু জিজ্ঞেস করব না দেখো।”
“এই মরেছে, আমি কি বললাম,
আর তুমি কি মানে করলে! যাক গে, বলো, তোমার অফিসের খবর কি?”
“ঠিকই আছে।”
“আচ্ছা, তোমার
ডিপার্টমেন্টে কি সবাই ছেলে, নাকি মেয়েও আছে দু’একজন?”
“না, সবাই ছেলে এবং
প্রত্যেকেই হ্যান্ডু, বুঝলে? তোমার মত ন্যালা-ক্যাবলা নয়।”
“হুম বুঝিলাম।”
“হি হি হি জেলাস-জেলাস,”
পাপিয়ার হাসি শুনে রাস্তায় হাঁটতে থাকা অচেনা দু’জন লোক ফিরে তাকাল ওদের দিকে।
“মোটেও আমি জেলাস নয়।”
“বললে হবে!
জেলাস-জেলাস-জেলাস।”
“বেশ-বেশ-বেশ। খুশী?”
“না, খুশী নই। এবার প্লিজ
একটু সিরিয়াস হও দীপ। একটা চাকরি-বাকরি জোটাও। এরপর বয়স পেরিয়ে গেলে...”
“চেষ্টা তো করছি।”
“ধুস, ছাই চেষ্টা করছো।
বুঝবে একদিন।”
*******
অফিসে মন দিয়ে একটা ক্রাইম স্টোরির ইলাস্ট্রেশন করছিলো
পাপিয়া। বেশ ঝামেলার কাজটা। মাউসে হাত দিতেই আবার মোবাইলে মেসেজ টোন। দেখবে না
ভেবেও আলগোছে বাঁ হাতে মোবাইলটা তুলে দেখল, দীপ মেসেজ পাঠিয়েছে। মেসেজটা পড়েই জিভ
কাটলো পাপিয়া। এই যা, দীপকে চারটে নাগাদ ফোন করার কথা ছিল আজ। ভুলেই গিয়েছে! এখন
বিকেল পাঁচটা দশ। নিশ্চয়ই খুব রেগে গেছে দীপ। তাই ফোন না করে মেসেজ পাঠিয়েছে। এখন
যদি পাপিয়া ফোন করে, তাহলে ঝগড়া লেগে যাবার খুব চান্স। তাই পাপিয়াও কায়দা করে
মেসেজের উত্তর দিলো, তোমার চিন্তা থেকে দূরে যাইনি বন্ধু! এক মিনিটের মধ্যে আবার
উত্তর এল দীপের, বহোত খুব। যাক বাবা, ছেলেটার মাথা ঠান্ডা রয়েছে তার মানে। ফিক করে
হাসল পাপিয়া। আচমকা সেই দিনটার কথা মনে পড়ল, যেদিন অফার-লেটার নিয়ে প্রায়
ভাসতে-ভাসতে ডালহৌসি থেকে শ্যামনগরে বাড়ি ফিরেছিল ও। বিশ্বাসই হচ্ছিল না, জীবনের
প্রথম চাকরিটাই এত নামকরা কোম্পানিতে হবে!
মাইনে অবশ্য খুব বেশী নয়, প্রথম ছ’মাস সাত হাজার। তারপর
কনফার্ম হলে দশ। তখন পি এফ-টি এফও পাওয়া যাবে। যাক গে, ফ্রেশার হিসাবে যথেষ্ট। ওই
দিন সন্ধেবেলা দীপের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কথাটা কি ভাবে জানাবে, ভাবছিল পাপিয়া।
একই সঙ্গে আনন্দ আর টেনশন আর খানিকটা মনখারাপও ছিল। চাকরিতে জয়েন করলে আর তো রোজ
দেখা হবে না দীপের সঙ্গে। অফিস আওয়ার বেলা একটা থেকে রাত আটটা। রোববার ছুটি। রাতে
বাড়ী ফিরতে রোজ সাড়ে নটা-দশটা। তার মানে এরপর থেকে সপ্তাহে শুধু একদিন দেখা হবে।
গত তিন বছর ধরে প্রায় রোজই দেখা হতো দু’জনের। মিট করার জায়গা ছিল শ্যামনগর স্টেশন।
সেখান থেকে হাঁটা শুরু করতো দু’জন। হাঁটতে হাঁটতে সেই বিটি রোড গঙ্গার ঘাটে।
সেখানে মিনিট পনেরো বসে আবার ফিরতি হাঁটা শুরু। ফেরার সময় আর পা চলত না পাপিয়ার।
ব্যথা করত। তবু যতক্ষণ হাঁটা, ততক্ষণই অফুরন্ত কথা। দীপের মতে, এই তিন বছরে ওরা যে
পরিমাণ হেঁটেছে, তার পুরোটা যোগ করলে চাঁদে পৌঁছে যাওয়া যেত। ছেলেটার শুধু
ফাজলামি। কোনও মতে বি এসসি পাশ করে শ্যামনগর পোস্টঅফিসের সামনে সিঁড়িতে বসে রোজ
দু’বেলা বেকার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারত আর বিড়ি খেত। পাপিয়া কোনও কোনও দিন কলেজ
কিংবা আউটডোর সেরে সন্ধে নাগাদ পোস্টঅফিসের সামনে দিয়েই হেঁটে বাড়ী ফিরতো।
ছেলেগুলোর হইচই কানে আসত। ফিরে তাকায়ওনি কোনোদিন। এমনই একদিন পাপিয়া ফিরছিল ওখান
দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গীতাও ছিল। দু’জনেই বেশ গল্প করতে করতে সবে পোস্টঅফিসটা পেরিয়েছে,
হঠাৎ সাইকেল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো একটা ছেলে। মুখটা চেনা। তবে কোন পাড়ায় থাকে
জানা নেই। ওই সিঁড়িতে বসে আড্ডা মারতে দেখেছে বারকয়েক। ছেলেটা সাইকেল থেকে নেমে
পাপিয়াকে সরাসরি বলল, “শোনো, তোমাকে একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“এই রবিবার বিকেলে একবার
আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে?”
একজন অচেনা ছেলের মুখে হঠাৎ
এমন প্রস্তাব শুনে, মনে-মনে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল পাপিয়া। কিন্তু বাইরে তা বুঝতে না
দিয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিল, “হঠাৎ আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসব কেন? আপনি কে?
ঠিক চিনলাম না তো।”
“আমার নাম দীপ রঞ্জন
চ্যাটার্জী। এই সাহেব বাগানে বাড়ী। আমি কিন্তু তোমাকে ভালো করেই চিনি। তুমি পাপিয়া
মিত্র। ছবি আঁক। ঠিক তো?” বলে মুচকি হাসি।
“হ্যাঁ, কিন্তু তার জন্য
দেখা করতে আসার কারণটা ঠিক বুঝলাম না।”
“আসলে তোমার সঙ্গে কথা বলতে
খুব ইচ্ছা করে, তাই।”
“কি কথা?”
“এখন বলতে ইচ্ছে করছে না।
সেদিন এলে বলব।”
“মনে হয় সম্ভব হবে না”,
একটু বিরক্তই হয়ে উঠেছিল পাপিয়া।
“বেশ তো। সম্ভব মনে
হলেই না হয় এসো, আমি অপেক্ষায় থাকবো”, বলে আবার সেই সুন্দর হাসিটা ছড়িয়ে দিয়ে
সাইকেলে চেপে চলে গিয়েছিলো দীপ। পাপিয়া ঠিকই করে নিয়েছে, যাবে না। কিন্তু সেদিন
বাড়ী ফিরে রাতে বিছনায় ছটফট। ‘অপেক্ষায় থাকবো’ শব্দটা এত বিচ্ছিরি যে, মাঝের ক’টা
দিন ভীষণ অন্যমনস্ক কাটিয়ে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হাফিয়ে উঠে, শেষ পর্যন্ত
রবিবার বিকেলে পাপিয়া গিয়েছিল দীপের সঙ্গে দেখা করতে। মনে-মনে ঠিকই করে রেখেছিল,
ছেলেটা ন্যাকা ন্যাকা ভাবে প্রেম নিবেদন করলেই সটান ‘না’ বলে দিয়ে চলে আসবে।
কিন্তু ফরসা, রোগা, লম্বা মত ছেলেটা একবারের জন্যেও ওইসব কথা উচ্চারণ করেনি। বরং
ও, বাঁ পাশে ঝমঝম শব্দের সাইকেল, আর ডান দিকে পাপিয়া, এই তিনজনে মিলে টানা আড়াই
ঘন্টা হেঁটেছিল। কত গল্প, কত সহজ মজা, মনেই হয়নি এতক্ষন সময় কি ভাবে পার হয়ে
গিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে সেদিন রোজকার চেনা রাস্তাগুলোও মনে হচ্ছিল অচেনা। সঙ্গীতা
খবর পেয়ে গিয়েছিল পরের দিনেই। সকালেই ছুটতে ছুটতে এসেছিল পাপিয়ার বাড়ীতে, “কি রে,
শেষ পর্যন্ত দীপের জলে ভাসিয়া...”
“কি বাজে বকছিস!”
“না না আর ঢপ দিয়ে লাভ নেই
বস। কাল পুরা দুনিয়া দেখা হ্যায়, শোলা অউর শবনম, দোনো কো এক সাথ।”
“তো কি হয়েছে? কথা বলেছি
শুধু।”
“ব্যস ব্যস, এই কথা কদ্দুর
এগোবে আমার ভালোমতো জানা আছে।”
“কিছুই এগোবে না দেখে নিস।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত
সঙ্গীতার কথাই সত্যি হয়েছিলো। সেদিন বিকেলের শুরু হওয়া কথা চলতে-চলতে প্রায় তিন
বছর হয়ে গেল, আর ফুরল না।
যেদিন অফার লেটারটা
পেয়েছিল, সেদিনই সন্ধেবেলা দীপের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে খুব টেনশনে ছিল পাপিয়া।
চাকরি পাওয়ার কথাটা বারবার বলতে গিয়েও মুখে আটকে যাচ্ছিল। শিয়োর ছিল, পাগলটা যেই
শুনবে এই চাকরির জন্য আর রোজ ওদের দেখা হবে না, অমনি বলবে, না না এ চাকরি করতে হবে
না। অন্য চাকরি খোঁজো। দুরুদুরু বুকে শেষ পর্যন্ত দীপকে জানানোর পরই দীপ উচ্ছসিত।
এমনকি, পাপিয়ার যে এরপর বাড়ী ফিরতে রাত হবে, রোজ আর দেখা হবে না, সে কথা জানার পরও
একইরকম খুশী। পাপিয়া বলেই ফেলেছিল, “তার মানে, তোমার কষ্ট হবে না! আমাদের কিন্তু
এরপর থেকে আর রোজ দেখা হবে না!”
“কি আর করা যাবে বলো? চাকরি
তো তোমাকেই করতে হবে। ব্রাইট কেরিয়ার। আমার অবস্থা তো তোমার জানাই আছে। খুব বেশী
হলে একটা মুদির দোকান দেব, হা হা হা!”
“পাপিয়া হাসেনি। শুধু খুব
অবাক হয়ে তাকিয়েছিল দীপের মুখের দিকে।
*******
“তোমার কাজ কেমন চলছে?”
“এই! একটা দারুণ খবর আছে।”
“কি?”
“এবারের স্পেশাল ইস্যুর
কভার আমি করছি।”
“বাঃ, খুবই ভালো খবর। ভালো
খবরই তো?”
“অফকোর্স ভালো খবর। তোমার
ডাউট আছে?”
“বিন্দুমাত্র না। আসলে এই
স্পেশ্যাল ইস্যু ব্যপারটা আমি চোখে দেখিনি তো, তাই গুরুত্বটা...”
“আর জানতেও হবে না, চিরকাল
বোকা হয়েই থেকো,” রাগ হয়ে গেল পাপিয়ার।
দীপ নিজের ডান হাতটা সামনে
বাড়িয়ে পাপিয়ার হাতটা ধরল। এত সুন্দর করে আঙ্গুলগুলো ধরে ছেলেটা। এত স্নিগ্ধ
স্পর্শ, কথা আসে না। শুধু চোখ বুজে অনুভূতিটা নিতে ইচ্ছা করে।
“কি! মাথা ঠান্ডা হচ্ছে?”
সহজ হেসে জিজ্ঞেস করলো দীপ।
“খুব পাজি,” আর কিছু বলতে
পারল না পাপিয়া। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ধারে বি টি রোডে এল। শ্মশানের পাশ
দিয়ে যাওয়ার সময় দীপ বলল, “চলো এবার ঘাটে যাওয়া যাক,” বলেই জিভ কেটে হেসে বলল,
“এহে মানে ঘাটে বসা যাক। এই ঘাটটা বেশ পরিষ্কার থাকে, বসবে?”
“সবসময় ফাজলামি। এইজন্য তো
কিছু হল না তোমার।”
“কি বলছেন ম্যাডাম, এত
সুন্দর একজন হবু স্ত্রী জোটালাম, এত কষ্ট করে, আর বলছেন কিচ্ছু হল না!”
পাপিয়া মুখে কিছু না বলে
শুধু কটমট করে তাকাল।
“না বসাই ভালো, কি বলো?
শ্মশানে ভুতটুত থাকতে পারে সন্ধেবেলা। তার চেয়ে বরং খেয়াঘাটে বসা ভালো।”
“আমি কোথাও বসব না। বাড়ী ফিরবো।”
“প্লিজ পুপু, একটু বসি, খুব
পা ব্যথা করছে আমার। মাইরি বলছি।”
পাপিয়াও ক্লান্ত হয়ে
পড়েছিল। খেয়াঘাটটা শ্মশানের থেকে বেশ খানিকটা দূরে। দু’জনে হেঁটে গেল ওখানে। চওড়া
সিঁড়ির একটা ধাপে বসল দু’জনে। অনেকেই বসে আছে। বুড়ো-বাচ্চা, অল্পবয়সি ছেলেরা,
প্রেমিক-প্রেমিকা। যে যার মত গল্পে মসগুল। এখন গঙ্গায় হাওয়া নেই। স্থির জল। পুরো
পরিবেশটাই কেমন যেন থমথমে। এত বড় একটা ফাঁকা জায়গা বড্ড বেশী শূন্য মনে হচ্ছে।
দীপ বলল, “কেমন একটা
অস্বস্তি হচ্ছে, তাই না?”
“হুম।”
“কেমন যেন গুমোট।”
“হুম।”
“তুমিও দেখছি গঙ্গার মত হয়ে
গিয়েছ।”
“কেন?”
“এই যে গুম মেরে রয়েছ।”
হাসল পাপিয়া। আসলে হঠাৎ
পলাশকাকুর কথা মনে এল।
“কি ভাবছো বল তো?”
“না, কিছু না।”
“ধুত্তোরি! বলবে তো?”
পাপিয়া আরো কিছুক্ষণ ঠোঁট
কামড়ে চুপ করে বসে বলল, “আচ্ছা, পলাশকাকুকে তোমার কেমন লাগে?”
“পলাশকাকু? ও আচ্ছা সেই
ভদ্রলোক। হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করছ?”
“বলো না কেমন লাগে?”
“কি করে বলি বলো? আমি তো
ভদ্রলোকের সঙ্গে কোনোদিন কথাই বলিনি। তবে তোমার কাছে যা শুনেছি, তাতে তো ভালোই মনে
হয়। তোমাদের যথেষ্ট হেল্প-টেল্প করেন।”
“হুম”, বলে কিছুক্ষণ চুপ
থেকে হঠাৎ পাপিয়া মুড চেঞ্জ করে বলল, “এই জানো, আমাদের সার্কুলেশনে কাল একজন জয়েন
করেছেন, উফ লোকটাকে যা দেখতে না! ফাটাফাটি।”
“যাক নিশ্চিন্ত হলাম,” বলে
দীপ হাত তুলল।
“কেন?”
“তোমার অ্যাদ্দিনে একটা
হিল্লে হল বলে!”
“হিল্লে! আমার?”
“হুম। এবার ওই ফাটাফাটির
প্রেমে পড়িবে। তাহার পর...”
“তাহার আগে তোমার গালে একটি
থাপ্পড় পড়িবে। সত্যি দীপ, তুমি না কেমন জানি একটা! কোনো পজেসিভনেস নেই। আমি যদি
কোনোদিন চলেও যাই, তোমার কিস্যু এসে যাবে না।”
“তাই? তবে তুমি যদি
আমাকে ছেড়ে চলে যাও, এই জিনিষটা কিন্তু তোমাকে আর কেউ দেবে না,” বলে পাঞ্জাবির
পকেট থেকে দু’টো পাতা সমেত একটা গন্ধরাজ ফুল বের করে পাপিয়ার হাতে দিল দীপ। ফুলটা
আলতো মুঠোয় ধরে নাকের সামনে নিয়ে এল পাপিয়া। কেমন বৃষ্টি-বৃষ্টি গন্ধ। খুব নিচু
গলায় পাপিয়া বলল, “আমার ভয় করে দীপ।”
“ভয়? কিসের ভয়?”
“জানি না। সবকিছু ঠিকঠাক
থাকবে তো?”
“কেন থাকবে না? সব ঠিক
থাকবে।”
“কি জানি! শুধু মনে হয়, এই
বুঝি সব ভেঙ্গে গেল। তছনছ হয়ে গেল। কেন এমন মনে হয় দীপ?”
“এত ভাবনার কি আছে? চলতে
দাও। চলতে চলতে যদি ভাঙ্গে, তা হলে চলতে চলতেই আবার ঠিক গড়ে উঠবে। শুধু থেমে যেও
না।”
গন্ধরাজ ফুল-সমেত দীপের
হাতটা ধরল পাপিয়া।
*******
“আজ একটা কাণ্ড হল জানো,”
সাইকেল থেকে নেমেই বলল দীপ।
“কি কাণ্ড?” দীপের দিকে না
তাকিয়েই হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল পাপিয়া।
“তোমার যে পলাশকাকু আছেন,
আজ সকালে আমাকে বাজারে ধরেছিলেন।”
“তোমাকে, বাজারে, মানে?”
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল পাপিয়া।
“আবার দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?
হাঁটতে হাঁটতে বলছি চলো”, বলে একহাতে সাইকেলের হাতল আর অন্য হাতে পাপিয়ার আঙ্গুল
ধরে হাঁটতে শুরু করল।”
“কি বলল শুনি?” অস্থিরভাবে
জিজ্ঞেস করল পাপিয়া।
“তেমন কিছু না। আসলে আমি
গিয়েছিলাম মাছ কিনতে। কাটাপোনা। খানিকটা ডিমও কিনলাম। অনেকদিন বড়া খাইনি।”
“উফ আসল কথাটা বলবে প্লিজ।”
“আমাকে ডেকে বললেন, শোনো
ভাই, তুমি কি মিত্র বাড়ীর হবু জামাই?”
“আমি বাড়ী যাচ্ছি”, বলে
পাপিয়া হঠাৎ পিছন ফিরে হাঁটা দিল।
“এই না না, শোনো
শোনো, আচ্ছা বেশ এবার সিরিয়াসলি বলছি,” বলে পাপিয়ার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে আনল
দীপ। তারপর বলল, “লোকটা একটু অদ্ভুত টাইপের, তাই না? আমাকে ডেকে প্রথমেই জিজ্ঞেস
করল, আমি তোমার বন্ধু কিনা। স্কুলের না কলেজের বন্ধু। কত দিনের বন্ধু।”
“কি বললে তুমি?”
“বললাম, এমনিই বন্ধু।
কলেজের নয়, কলিজার।”
“আ-বা-র!”
“আচ্ছা আচ্ছা,” আমি
শুধু বললাম, “স্কুল-কলেজ না, এমনিই বন্ধু। উনি শুনে বললেন, হুম। তারপর গম্ভীর গলায়
জিজ্ঞেস করলেন, ওঁকে চিনি কি না। বললাম, মুখ চিনি। আপনি বোধহয় পাপিয়ার রিলেটিভ হন।
আবার তিনি বললেন, আমি পাপিয়ার কাকা হই। তা কি করো তুমি? জানালাম, টিউশন করি,
বাড়ী-বাড়ী গিয়ে। আমি আগেই বুঝে গিয়েছিলাম, ওঁর নেক্সট প্রশ্নটা হবে চাকরির চেষ্টা
করছি কিনা, তাই আগেই উত্তর দিয়ে দিলাম, চাকরির চেষ্টা করছি, পাচ্ছি না। আপনার কোনো
চেনাশোনা থাকলে জানাবেন। আমি অনার্স কাটা বি এসসি।”
“ইস এসব কথা তুমি ওকে বললে।”
“হ্যাঁ বললাম।”
“ওই লোকটার কাছে তুমি চাকরি
চাইলে! একটা অচেনা লোকের কাছে তোমার কি লজ্জা-শরম মান-ইজ্জত স-ব গিয়েছে?” এক ঝলক
দীপের দিকে তাকিয়ে বলল পাপিয়া।
“দ্যাখো ভাই,” পরিষ্কার
গলায় বলল দীপ, “বেকার ছেলেদের একমাত্র তাদের প্রেমিকা ছাড়া, আর সবাই করুণা করতে
খুব ভালবাসে। সে জন্য বলে দিলাম। কিন্তু এরপর উনি কি বললেন জানো?”
“কি?”
“তোমাদের বাড়ীতে একদিন সময়
করে যেতে বললেন। গল্প করার জন্য।”
“কি!” আবার থমকে দাঁড়িয়ে
পড়ল পাপিয়া, “পলাশকাকু তোমাকে আমাদের বাড়ীতে গল্প করতে যেতে বলেছে। লোকটার গার্জেনগিরি
আর সহ্য হয় না আমার। আচ্ছা উনি কে, আমার বাড়ীতে কে যাবে না যাবে সেটা ঠিক করার?”
“এই রে রেগে গেলে নাকি?
না-না তোমার ভয় নেই, আমি যাচ্ছি না। যদি তুমি কোলে করে নিয়ে যাও, তা হলে অবশ্য...”
“ইয়ার্কি কোরো না তো। মাথা
গরম হয়ে আছে আমার।”
“মাথাটা আমার দিকে একটু
ঝোঁকাও।”
“কেন?”
“একটু ফুঁ দিয়ে দেখি।
কিছুটা অন্তত যদি...”
হেসে ফেলল পাপিয়া, “তুমি না
একটা...” বলেই গুম-গুম করে কয়েকটা কিল বসাল দীপের পিঠে।
“ফুচকা খাবে?”
“খাব।”
রাস্তার ধারে ফুচকার সামনে
দাঁড়িয়ে শালপাতার ঠোঙা হাতে নিয়ে দীপ বলল, “আচ্ছা পাপিয়া, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস
করব?”
“এই ঝাল বেশী দেবে,”
ফুচকাওয়ালাকে নির্দেশ দিয়ে পাপিয়া বলল, “বলো।”
“তোমার কাছেই শুনেছি, এই
পলাশকাকু লোকটা একসময় তোমাদের অনেক হেল্প করেছে, তবু তুমি ওর উপর এত চটা কেন বলো
তো?”
পাপিয়া স্থিরভাবে তাকাল
দীপের দিকে। বলল, “ভাঙা জিনিস জোড়া লাগানোর পর, আঙুলে লেগে থাকা শুকনো আঠা যখন
খুঁটেও তোলা যায় না, তখন কেমন লাগে তোমার?”
“হুম বুঝেছি। ফুচকা খাও।”
*******
“কি করছ?”
“এই তো। তেমন কিছুই না।”
“কেন?”
“প্রজাপতির নির্দেশে।”
“বটে?”
“হুম।”
“কি বললেন প্রজাপতি?”
“বললেন, ‘যাও পুত্রী, তোমার
একমাত্র হিরের টুকরো পুত্রের জন্য সুযোগ্য কন্যা অনুসন্ধান করে আনো।’”
“অনুসন্ধান? তার মানে এখনও
খোঁজ চলছে?”
“এই না, মিস্টেক-মিস্টেক।
খুঁজে পাওয়া হয়ে গিয়েছে। এখন ওই কথাবার্তা বাকি আর কি।”
“হা হা হা,” হাসল দীপ।
“হাসি না, আমি কিন্তু
সিরিয়াসলি বলছি। মা জিজ্ঞেস করছিল, কবে যাবে তোমাদের বাড়ী।”
“হুম, বলতে পারি। কিন্তু
আগে বলো, বিয়ের পরে আমাকে হনিমুনে কোথায় নিয়ে যাবে?”
“আমি তো ভেবে রেখেছি
এভারেস্ট। রাজি তো?”
“হ্যাঁ রাজি। কিন্তু
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে, মনে রেখো।”
“অ্যাঁ! বেশ, ভেবে রেখেছি।”
এবার হেসে উঠল দু’জনেই।
রাত প্রায় দশটা। পাপিয়া ফ্ল্যাটের ছাদে পায়চারি করছিল আর মোবাইলে দীপের সঙ্গে গল্প
করছিল। চাঁদ ফেটে গলগল করে জ্যোথস্না পড়ছে পৃথিবীর বুকে। ভাগ্যিস, লোডশেডিং এখন।
পাপিয়া ভাবল, জ্যোথস্না রাতে সরকার থেকে নিয়ম করে দেওয়া উচিত যে, রাজ্যে কোথাও
কোনও ইলেকট্রিক আলো জ্বালানো যাবে না। দীপের সঙ্গে কথা বলতে এখন খুব খুব ভালো
লাগছে। এই সময় যদি ও কাছে থাকত...
“এই মনে পড়েছে, সেই কবে
থেকে তোমাকে জিজ্ঞেস করব, কিন্তু পরে আর মনেই থাকে না,” বলল দীপ।
“তুমি ভুলে যাও, এ আর নতুন
কি? এরপর বোধহয় আমাকেও আর মনে রাখবে না,” চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল পাপিয়া, “যাক গে,
বলো এবার কি ভুলেছ?”
“তোমার সেই রিলেটিভ এখন
কেমন আছেন?”
“রিলেটিভ! কোন রিলেটিভ?”
“আরে, যিনি অসুস্থ হয়ে
পিজিতে ভর্তি হয়েছিলেন।”
“কি যা তা বলছ! মাথাটা
গিয়েছে নাকি?”
“যা বাব্বা! কাকিমার সঙ্গে
দেখা হয়েছিল আমার। সঙ্গে তোমার কি বলে ওই পলাশকাকুও ছিলেন।”
“মানে! কবে দেখা হয়েছিল
তোমার ওদের সঙ্গে? কোথায় দেখা হয়েছিল?” বেশ জোরে চিৎকার করে এবার প্রশ্নটা করল
পাপিয়া।
“তা প্রায় বেশ কিছুদিন
হল। আমি অ্যাকাডেমিতে গিয়েছিলাম।নন্দনের পিছনে দেখা হয়েছিল। ওই পলাশকাকুই তো
বলেছিলেন, তোমার কোন এক রিলেটিভ পিজিতে ভর্তি আছেন তাকে দেখতে...কেন কাকিমা কিছু
বলেনি তোমায়? হ্যালো হ্যালো পাপিয়া...”
ফোনটা কেটে দিয়ে হুড়মুড় করে
সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকল পাপিয়া। “মা-আ-আ, মা-আ...” চিৎকার করে ডাকল।
“কি হল?” কিচেন থেকে সাড়া
দিল মাধবী।
“তুমি পলাশের সঙ্গে নন্দনে
গিয়েছিলে?”
মাধবী চুপ।
“চুপ কেন? বলো গিয়েছিলে?
কেন গিয়েছিলে? আমাকে বলোনি কেন? কেন বলোনি?” ক্রমাগত গলা চড়তে থাকে পাপিয়ার। রাগে
ভয়ঙ্কর কিছু একটা করে ফেলতে ইচ্ছা করছে। আবার চিৎকার, “কেন-ও-ও?”
“কি করছিস পুপু? এভাবে কেন
চিৎকার করছিস?”
“আমাকে বলো, কেন তুমি ওই
লোকটার সাথে নন্দনে গিয়েছিলে? আমাকে কেন চিরকাল মিথ্যে বলে এসেছ? লজ্জা করে না
তোমার? ছিঃ! ছিঃ!”
“না, করে না,” এবার উত্তর
দিল মাধবী, “আমি মানুষ নই? আমার নিজের কোনও জীবন থাকতে পারে না? শুধু সারাদিন মুখ
বুজে একা-একা কাজ করে যাওয়ার মেশিন আমি?”
পাপিয়া কি একটা বলতে গিয়েও
আচমকা থেমে গেল। তারপর বলল, “তার মানে এত বছর ধরে তুমি আমাকে ঠকিয়েছ? বলো ঠকিয়েছ।
কেন ঠকালে?” আবার চিৎকার।
“ঠকাব কেন? তোর বাবা চলে
যাওয়ার পর আমার সঙ্গে আর কে ছিল? কেউ না। শ্বশুরবাড়ীর দিকের একটা লোক একদিনের জন্য
এসে খোঁজ নিয়ে দ্যাখেনি, আমি কেমন আছি। এই লোকটা ছিল বলে সেদিন সংসারটা ভেসে
যায়নি। বড় হতে পেরেছিস। মনে রাখিস।”
“আর আমি যদি বলি,
আমার বাবা মারা যাওয়ার জন্যও ওই লোকটাই দায়ী। তুমিও। তোমাদের জন্যই বাবা...” কথাটা
শেষ হওয়ার আগেই সপাটে থাপ্পর এসে পড়ল পাপিয়ার গালে। খেয়ালই করল না পাপিয়া। কেমন
ঘোরের মধ্যে বলে যেতে থাকল, “সবাই ঠকিয়েছে আমাকে, বাবাকে। সবাই। আমি জানি তোমরা...”
“মুখ সামলে কথা বলবি
পাপিয়া। একদম উল্টো-পাল্টা দোষ দিবি না। কি ভেবেছিস, সারাজীবন তোর দাসত্ব করব?”
হিসহিস করে উঠল মাধবী।
“কি করতে চাও তুমি বলো?”
“আর কয়েকদিন পর তো বিয়ে করে
ড্যাংড্যাং করে চলে যাবি। তারপর আমার কি হবে, আমি একা-একা কি করব কখনও ভেবেছিস?
বাকি জীবন আমার কিভাবে কাটবে চিন্তা করেছিস কখনও?”
“তুমি কি করতে চাও বল?”
নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল পাপিয়া।
মাধবীও গলা নামাল। তারপর
বলল, “তা হলে শোন, আমি পলাশকে ভালোবাসি এবং ওকে বিয়ে করব। তোকে এর মধ্যেই বলতাম।”
“বাঃ! এটাই আন্দাজ করছিলাম।
তা বিয়েটা কি আমার বিয়ের দিনই করতে চাও?” কথার মধ্যে যতটা ঘৃণা মেশানো সম্ভব, ঠিক
ততটাই মেশাল পাপিয়া।
পাপিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে
মাধবী বলল, “আমরা ভেবেছিলাম, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমি আর পলাশ লিগ্যালি...কিন্তু
যেহেতু তুমি কবে বিয়ে করবে কিনা ঠিক করোনি, আর পলাশেরও ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে, তাই
আমরা বোধহয়...”
“কি ভেবেছ তোমরা? যা খুশী
তাই করবে?” আবার আচমকা চিৎকার করল পাপিয়া, “এত নোংরা তুমি? বাবাকে খুন করেছ তোমরা।
আমি হতে দেব না, হতে দেব না,” বলতে বলতে হঠাৎ ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল
পাপিয়া। সিঁড়ি দিয়ে মাতালের মত এলোমেলো নামতে থাকল।
“কেন কি করবি তুই? কি করবি?”
“দেখবে কি করব?” বলতে বলতে হঠাৎ
ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল পাপিয়া। পিছন থেকে চিৎকার করতে থাকল মাধবী, “কোথায়
যাচ্ছিস তুই?”
*******
গোটা পৃথিবীর রাস্তায় চাঁদের আলো শুয়ে রয়েছে। এখন লোডশেডিং।
চারপাশের মানুষগুলো আলো মেখে অচেনা। দ্রুত হাঁটছিল পাপিয়া। যতটা জোরে হাঁটা যায়।
মাথার ভিতর ভোঁ-ও-ও করে একটানা শব্দ হয়ে চলেছে। তালা ধরে গিয়েছে কানে। হাতের মুঠোয়
ধরা ফোনটায় বারবার ফোন আসছে। একবার মা আর একবার দীপের। পা অবশ হয়ে আসছে হাঁটতে
হাঁটতে। একসময় পৌঁছল রেল স্টেশনের সামনে। দু’টো সমান্তরাল ধাতব লাইন চাঁদের আলোয়
সাপের শরীরের মত চিকচিক করছে। প্ল্যাটফর্মে এত রাতে প্রায় কেউ নেই। লাইনের উপর এসে
দাঁড়াল পাপিয়া। চারদিকে ঝাপসা অন্ধকার। মাথার ভিতর অসহ্য সব শব্দ নিয়ে পা টেনে
টেনে সোজা হাঁটতে শুরু করল লাইনের উপর দিয়ে। মাথার ভিতর কোনও স্মৃতি নেই, অনুভূতি
নেই, শুধু অসহ্য ঝিঁঝিঁর শব্দ গোটা পৃথিবী জুড়ে। মোবাইলটাকে আলগোছে ছুঁড়ে ফেলে দিল
লাইনের পাশে। পিছনে দূর থেকে তীব্র আলো ছড়িয়ে বারবার হুইসেল দিতে-দিতে ছুটে আসতে
লাগল একটা ট্রেন। খুব কাছে এসে শেষ মুহূর্তে ড্রাইভার বুঝতে পারল, মেয়েটা আর সরবে
না। প্রচণ্ড শব্দ করতে করতে একই গতিতে চলে গেল ট্রেনটা। লাইনের মাঝখানে জ্যোথস্না
মেখে সারা রাত উপুড় হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে রইল পাপিয়া। আর লাইনের পাশে পড়ে থাকা মোবাইলটা
মাঝেমধ্যেই জোনাকির মত জ্বলে উঠতে থাকল অন্ধকারে। ডাকতে থাকল কাউকে...
টিউশন সেরে বেরল দীপ। রাত সাড়ে ন’টা। সামনের মাসে চাকরিতে
জয়েনিং। এই মাসেই টিউশন করার জীবন শেষ। এরপর অফিস সেরে বাড়ী ফিরে কি করবে জানে না।
এক মুহূর্তের জন্যও ফাঁকা থাকতে ইচ্ছা করে না। একা হতে ভয় করে ভীষণ। সারাক্ষন কাজ
থাকলে ভালো লাগে। মনে রাখার চেয়েও ভুলে যাওয়া যে আরও কঠিন, আগে বিশ্বাস করত না
দীপ। আজ সারাদিন বড্ড গুমোট ছিল। এখন আকাশ লাল। মাঝে-মধ্যে মেঘ ডাকার সামান্য
শব্দ। এই টিউশনির বাড়ীটা পাপিয়াদের ফ্ল্যাটের কাছেই। পাপিয়া ওভাবে চলে যাওয়ার পর
এই টিউশনটা ছেড়ে দিতে চেয়েছিল দীপ। কিন্তু স্টুডেন্টের সামনে পরীক্ষা আর অভিভাভকের
অনুরোধে শেষ পর্যন্ত পারেনি। ফ্ল্যাটটার পাশ দিয়ে যাওয়া-আসার সময় নিঃশ্বাস বন্ধ
রাখে ও। ওইটুকু পথ অসহ্য দীর্ঘ মনে হয়। আজও সাইকেল চালিয়ে পাপিয়াদের ফ্ল্যাটের পাশ
দিয়ে ফিরছিল। হঠাৎ গান কানে এল। চেনা গলা। তাকাব না ভেবেও একবারের জন্য ফ্ল্যাটের
দিকে তাকিয়ে ফেলল। পাপিয়ার মা। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গাইছেন। মহিলা যে একটু কেমন হয়ে
গিয়েছেন সেটা জানা। এখনও কি সুন্দর গলা! নিজের অজান্তেই সাইকেল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল
দীপ। রাস্তা ফাঁকা। মেঘ ডাকল। মাধবী গাইছে- “ঝরঝর বরিষে বারিধারা...হায় পথবাসী হায়
গতিহীন হায় গ্রিহহারা...”গানের সঙ্গে ব্যালকনি থেকে সামনে অনেকটা ঝুঁকে এমনভাবে দু’হাত
ছড়িয়ে দিয়েছে, যেন বৃষ্টির জল ছুঁচ্ছে। সেই কল্পিত বৃষ্টির ফোঁটা মুঠোয় ধরে নিজের
মুখে-গলায়-হাতে মাখছে মাধবী। আবার মেঘ ডাকল। সঙ্গে একফোঁটা জল আকাশ থেকে পড়ল দীপের
গালে। এবার সত্যি বৃষ্টি হবে। গান ভেসে যাবে বৃষ্টির
জলে........................!!!!!!