“কেমন আছো পলাশ?”- ইতস্তত করতে থাকলেও সুরঞ্জনা পেছনে দাঁড়িয়ে
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় পলাশের দিকে।
বরাবরের মত আজও পৌষমেলাতে একাই এসেছে সুরঞ্জনা। পলাশের সাথে ৩ বছরের
সম্পর্কটা চুকিয়ে যাবার পর ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল যে, এরপর এই জীবনে যদি
কোনো সম্পর্কে জড়ায়, তাহলে সেটা কোনো অবাঙালী ছেলের সাথেই হবে। বাঙালী ছেলেরা হয়
বড্ড রগচটা আর না’হলে বড্ড ওভার প্রোটেক্টিভ হয়, মাথা গরম হলে পুরনো সমস্ত সুখের দিনগুলোর কথাও ওদের স্মৃতি থেকে আলগা হয়ে যায়। অনুজের সাথে ওর বিয়েটা
সম্বন্ধ করেই হয়েছিল, কারণ পলাশের সাথে
৩ বছরে হওয়া ঝগড়াগুলোর রেশটা ওর মাথায় রয়ে গেছিলো, বাড়ীর লোকও ওর সম্বন্ধটা
ওর পছন্দ অনুযায়ীই পাকা করেছিল।
কিন্তু বিয়ের ২-৩ মাসের মাথাতেই বাঙালী ছেলেদের নিয়ে এই জেনারালাইজড
চিন্তাভাবনা করাটা সুরঞ্জনার জীবনে বুমেরাং হয়ে ফিরেছিল। সব মারোয়াড়ী ছেলেরা
একরকম হয় না, কিন্তু অনুজের চিন্তাধারা সুরঞ্জনার ভাবনার
থেকে পুরোপুরি অন্য গোলার্ধে থাকে। হানিমুনের পর থেকে যতবার অনুজের থেকে ও নিজেদের ২ জনের
জন্য সময় চেয়েছে, ততবারই এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। যে সময়ে পৌঁছতে না পারার
জন্য ও পলাশের সাথে এত ঝগড়া করত, আজ বিয়ের পর সেই ওর
জন্য সময় বার করাটাকেই অনুজ সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেয়।
আজও মেলাতে আসার আগে অনুজকে ওর সঙ্গে আসতে অনুরোধ করেছিল সুরঞ্জনা। উত্তরে সেইকথাটাই অনুজ
আবার বলেছে, যেটা ও প্রতিবার বলে থাকে- “আরে আগার তুমহারে সাথ হার জাগা
তুমহারে পিছে পিছে জাউঙ্গা তো তুমহারে ক্রেডিট কার্ড মে ব্যালেন্স ক্যায়সে ভারুঙ্গা
?? উসকে লিয়ে মুঝে কাম কারনা পাড়তা হ্যায়। তুম যাও, আগার কার্ড ম্যাক্স আউট হো যায়ে তো মুঝে কল কারনা। ওকে বেবি?”
খুব সাবধানে ওর পছন্দ করা একটা বাহারি চুড়ি দোকানদারের
কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ঐশীকে পরিয়ে দিচ্ছিল পলাশ। ২ বছর হয়েছে ওদের বিয়ে হয়েছে; কিন্তু এখনো পলাশ ঐশীকে এত আগলে রাখে যে, ওদের ২ জনকে দেখে সেটা বোঝাই যায় না। পিছনে একটা নারী কণ্ঠস্বর শুনে ওরা দু’জনেই ফিরে তাকায়।
“আরে সুরঞ্জনা!! কত দিন পর!! আমি ভালো আছি। তুমি ভালো আছো তো?? একা এসেছো কি?? বাই দা ওয়ে; পরিচয় করিয়ে দি, ও হচ্ছে আমার বউ; ঐশী।” একটানা কথাগুলো বলে থামল পলাশ।
“আমিও ভালোই আছি। হ্যাঁ, একাই এসেছি। হাই ঐশী!!”
“হ্যালো সুরঞ্জনা!!”- সুরঞ্জনার ব্যাপারে ঐশী আগেই সবটা শুনেছিল পলাশের থেকে; এই ব্যাপারে পলাশ ওর থেকে কিছুই লোকায়নি। আর মূলত বিয়ের পর পলাশ
ওর এত খেয়াল রাখে যে মাঝেমধ্যে ওর মনে হয়, ভালোই হয়েছে পলাশ
আর সুরঞ্জনার সম্পর্কটা টেকেনি; ব্যাপারটা অন্তত ওর
কাছে শাপে বর হয়েছে। মনে মনে এত কিছু ভাবলেও এই ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলে না ঐশী।
ওদের ২ জনের সাথে কথা বলতে বলতে সুরঞ্জনা ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যায় ৩ বছর আগের সেই বিকেলটাতে, যেদিন ওর আর পলাশের শেষবারের মত ঝগড়া হয়েছিল পলাশ সময়ে সিনেমাহলে পৌঁছতে না পারায়। প্রতিবারের মত এইবারও ঝগড়া করে বাড়ী ফেরার পর সুরঞ্জনা
ভেবেছিল, হয় পাগলটা মাঝরাতের মধ্যে ফোন করে ওকে মানিয়ে নেবে, আর তা না’হলে পরদিন সকালে ও পাগলটাকে ফোন করে
আদুরে বকে মানিয়ে নেবে। কিন্তু; এইবার ও ভুল ভেবেছিল, পলাশ রাতে ও’কে ফোন তো করেইনি, উল্টে পরদিন সকালে ও যতবার ফোন করার চেষ্টা করেছে, পলাশ কেটে দিয়েছে। ঝগড়াটাকে এইবার আর জাস্ট ঝগড়া হিসেবে নেয়নি পলাশ; বড্ড অপমানিত ফিল করেছিল ও মন থেকে! প্রতিবারের ঝগড়া থেকে
শেষবারের ঝগড়াতে এই একটাই পার্থক্য ছিল। প্রথম ১ মাস সুরঞ্জনাকে এড়িয়ে যাবার জন্য পলাশ প্রতিবার ও’র ফোন কেটে দিত, তারপর তো ফোন নম্বরই বদলে ফেলেছিল; আর নতুন ফোন নম্বরটা সুরঞ্জনাকে জানায়নি।
সুরঞ্জনা আশা করে বসেছিল, কোনো না কোনোদিন পলাশের ফোন ও’র ফোনে অবশ্যই আসবে; ফোন তো আসেনি, উল্টে এসেছিল পলাশের বিয়ের কার্ড। যে কার্ডের ভিতরে ওর নাম থাকার কথা ছিল, সেই কার্ডের বাইরে নিজের নাম দেখে রাগে দুঃখে কার্ডটা আস্তাকুঁড়েতে ছুঁড়ে ফেলার
পর সুরঞ্জনা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে, পলাশ যদি ওকে ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারে, তাহলে ওকেও পারতে হবে। ওর সাথে দেখা হবার প্ল্যান হলেই পলাশের এই পাংচুয়ালিটির অভাব, আর রাতে ও’কে একা কোথাও যেতে দেবার ব্যাপারে পলাশের জড়তা; এই ২ টো ব্যাপারকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল ও; সেই থেকেই ওর সব বাঙালী ছেলেদের একরকম
ভাবা আর মনে মনে অবাঙালী ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হবার শুরু!!
প্রায় একঘণ্টা একা একা ঘুরে বেড়ানোর
পর সুরঞ্জনা মেলা থেকে বেরিয়ে আসে, অনেক রাত হয়েছে, বাড়ী ফিরতে হবে। হঠাথ চোখের সামনে পিছনের দিক থেকে একটা সাইকেল রিক্সা
দেখতে পায় ও; সিটে ঐশী পলাশের ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে আছে..বেশ বুঝতে পারে। রিক্সাটা আসতে আসতে চোখের দৃষ্টি পেরিয়ে
গাড়িঘোড়ার ভিড়ে মিলিয়ে যায়..!! মেলার মাইকে গান বেজে ওঠে-“মেরে ন্যায়না.. সাওয়ান ভাদো.. ফিরভি মেরা মন প্যায়াসা.... ফিরভি মেরা মন প্যায়াসা....!!”
3 comments:
বাহ্!! বেশ হয়েছে লেখাটা। চালিয়ে যাও বন্ধু।। 👍👍
ধন্যবাদ ভাইটু
Lekhata khub bhalo hoyeche re, notun r ekta jonnyo opekhay roilam
Post a Comment