****
“ব্যর্থ প্রেমিক
আর খেটে খাওয়া শ্রমিক, এদের দুঃখ কেউ বোঝে না গো!!” সুমন দা’র দিকে তাকিয়ে উদাস
গলায় বলে উঠলাম।সুমন দা ফুটপাথের চায়ের দোকান টা থেকে চা নিয়ে এসে আমার পাশে বসে
বলল, “তা তুই কোন ক্যাটাগরিতে পড়িস, ব্যর্থ প্রেমিক না খেটে খাওয়া শ্রমিক?” লম্বু;
মানে আমাদের সায়ন দা বলে উঠল, “এখন তো ওকে ২ টো ক্যাটাগরিতেই ফেলা যায়। মুখটা
দ্যাখ, মজনু নাম্বার ওয়ান। আর আই. টি. ইন্ডাস্ট্রিতে এক বছর হতে না হতেই চোখের
তলায় কালশিটেও পড়ে গ্যাছে।”
“খিল্লি করছো তো!! মনে রেখো
আমারও সময় আসবে”- গলায় তেজ আনার চেষ্টা করলাম, পারলাম না।দুপুরে লাঞ্চ করে ফেরার
সময় চোখের সামনে যা দেখেছি, তারপর থেকে আমার সিস্টেম হ্যাং করে গেছে।
ফুটপাথের ধারে
লাইন দিয়ে বসেছিলাম আমরা। বিকেলের আলো মুছে গিয়েছে অনেকক্ষণ। কলকাতা পুরসভার
বিতর্কিত আবিষ্কার ত্রিফলা’র আলো রাস্তায় এসে পড়েছে আড়াআড়ি ভাবে। দক্ষিণ দিক থেকে
একটা হাওয়া বইছে। আজ ডিফেক্ট ট্রায়াগ কল্ শেষ হয়ে গিয়েছে একটু আগে আগেই। সামনেই
একটা নতুন বিল্ড রিলিজ। আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রেস্টিজিয়াস দিন। সৌরভ দা
আমাদের লিড। আজ ট্রায়াগ কলে আমি পুরো ছড়িয়েছি। প্রায় ৪ টে ডিফেক্ট মিস হয়েছিল আমার
মডিউল থেকে; ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারিনি। সৌরভ দা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠেছিল,
“প্রতাপ, ডিফেক্ট মিস হলে টেস্টারের জীবনে আর কিছু থাকে না রে। টেস্টারের টার্গেটই
হল ডিফেক্ট ধরা। আর তুই তো বারবার তোর টার্গেটটাই গুলিয়ে ফেলছিস। যা, টেস্টিং করা
ছেড়ে লুডো খেল।”
ইদানীং আমার
কিছুই ভালো লাগছে না। মনের মধ্যে অস্থির-অস্থির ভাব। লাঞ্চের সময় আমার যত্নে
ফোলানো স্বপ্নের বেলুনটায় কেউ পিন ফুটিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আমি জানি, ব্যর্থ প্রেমিক
আর খেটে খাওয়া শ্রমিকের দুঃখ কেউ বোঝে না। তাই একবুক দীর্ঘশ্বাস হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে
সুমন দা’কে কথাটা বলেছিলাম। আর সুমন দা আর সায়ন দা কি না এই অবস্থায় আমাকে উল্টে
হুল দিচ্ছে।
রঘু আমার মনের অবস্থা
বুঝে সুমন দা আর সায়ন দা’র উদ্দেশ্যে বলল, “কেন হুল দিচ্ছ, দেখছ তো চাপে আছে।”
সুমন দা গলা চড়িয়ে বলল,
“আরে কি না কি দেখেছে, তাতেই ওর হাওয়া বেরিয়ে গেল। বিধবা মাসিদের মত মুখ করে বসে
আছে।”
“আরে, আমি স্পষ্ট দেখেছি
ওকে বাইকে করে ছেলেটার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে!” হাত পা নেড়ে কথাগুলো ছুড়ে দিলাম।
“এতদিন কি ঘুমোচ্ছিলি? না
ওকে নিয়ে প্রেমগাথা লিখছিলি? কবে বলেছি তোকে, যা গিয়ে বলে দে। তা না সেই কবে থেকে
চাক্কি পিসিং অ্যান্ড পিসিং...”
সায়ন দা’র
কথাগুলো শুনে আমার গা জ্বলে উঠল। রাগটা আরও বাড়ছে। মনে হচ্ছে সায়ন দা’কে ফেলে
পেটাই। রঘু আমার দিকে তাকিয়ে বুঝল, সায়ন দা’র সঙ্গে এবার আমার লেগে যাবে। তাই ও
দ্রুত চুপ করে থাকা রীতেশকে বলল, “কী রে, প্রতাপের কেসটা তো জটিল হয়ে যাচ্ছে, কিছু
একটা চক্কর চালা। ঐ কারকুইন প্রতাপের ক্যারিয়ার শেষ করে দেবে। ও তো আজকাল ডেস্কটপে
শুধু কারকুইনের মুখই দেখতে পায়। সেই জন্য পাতি ইউ. আই. ডিফেক্টও মিস করে।”
এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকার
পর রীতেশ জিজ্ঞেস করল, “ছেলেটা কে রে?”
“কোন ছেলেটা?” খেই হারিয়ে
পাল্টা প্রশ্ন করলাম।
“হোয়াট দা হেল ইয়ার, যে
ছেলেটা তোর ঐ কারকুইনকে বাইকে করে নিয়ে ধাঁ হয়ে গেল?”
ওকে কারকুইন বললে আমার
মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু আমরা কেউই ওর নাম জানি না। শুধু দেখেছি একটা লাল রঙের
ইন্ডিকা গাড়ীতে অফিসে আসে, অফিস থেকে বেরনোর পর আবার ঐ গাড়ীটাতে করেই চলে যায়। তাই
আমার কলিগরা ওর নাম দিয়েছে কারকুইন।
আজ লাঞ্চের পর
থেকে সব ঘেঁটে গিয়েছে। ‘বুড়ীমার ভাতের হোটেল’ থেকে ফেরার পথেই দেখছিলাম অফিস থেকে
বেরিয়ে ও হাঁটতে হাঁটতে আসছে। ঠিক তখনই নীল রঙের একটা ঝক্কাস বাইক এসে থেমেছিল ওর
সামনে। হেলমেট মাথায় ছিল বলে ছেলেটাকে ভালো করে দেখতে পাইনি। ছেলেটা কিছু বলতেই ও
হেসে বাইকের পিছনে উঠে বসেছিল। তারপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে চোখের আড়াল হয়ে গিয়েছিল
ওরা।
****
ইঞ্জিনিয়ারিং
কলেজের পাট চুকিয়ে; গত বছর থেকে কলকাতার অন্যতম বড় আই. টি. কোম্পানিতে চাকরি করছি
আমি। এক বছরের অভিজ্ঞতাতেই ২ টো বেশ বড় রিলিজ একার কাঁধে উতরেছি। প্রোজেক্ট
ম্যানেজার থেকে শুরু করে আমার ট্র্যাক লিড, সবাই আমার উপর কাজের ব্যাপারে খুব ভরসা
করে। কলিগরা বলে, আমি অ্যাপ্লিকেশন নলেজ খুব তাড়াতাড়ি গ্র্যাব করতে পারি। সৌরভ দা
বলে, এভাবে কাজ করতে পারলে প্রতিটা রিলিজেই ক্লায়েন্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন বাঁধা। সত্যি
কথা বলতে কি, আমি অ্যাপ্রিসিয়েশনের চেয়েও আমার টেকনিক্যাল নলেজ এনহ্যান্স করতে
বেশী চাই। সৌরভ দা অবশ্য বার বার বলে, আমার যা ডেডিকেশন, আমি খুব সহজেই অটোমেশান
টেস্টিঙে শিফট করে নিতে পারব। পরের মাসেই আমার ট্র্যাকে প্রায় ১২০০ টা’র কাছকাছি
অটোমেশান স্যুট তৈরি হওয়ার কথা আছে। প্ল্যানটা এখনও অ্যাপ্রুভ হয়নি। কাজটা শুরু
হওয়ার পর একবার নিজেকে ওখানে ইনভলভ করতে পারলে লাইফ পুরো ঝিঙ্গালালা হয়ে যাবে।
আমাদের অফিসটা
সল্টলেকের একটা মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং এর ৯ তলায়। ১৫ তলা এই গগনচুম্বী বিল্ডিং এর
অন্যান্য ফ্লোরে আরও অনেক মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির অফিস আছে। আমাদের কোম্পানির
কলকাতা ব্রাঞ্চ প্রতি বছর ‘গালি ক্রিকেট’ বলে একটা ইভেন্ট অরগানাইজ করে। ২ টো
টিমের মধ্যে মোট আট ওভারের ফোর আ সাইড ক্রিকেট ম্যাচ। এই ইভেন্টটাতে অন্যান্য
প্রোজেক্টের মত আমাদের প্রোজেক্ট থেকেও কিছু লোক অংশগ্রহণ করে। আমি, সায়ন দা,
রীতেশ, রঘু- আমরা চারজন এই বছর ‘গালি ক্রিকেট’ এ আমাদের প্রোজেক্ট টিমকে
রিপ্রেসেন্ট করেছিলাম।
তো মাসদুয়েক আগে
আমরা ‘গালি ক্রিকেট’এর জন্য প্র্যাকটিস করছিলাম আমাদের অফিসের বিল্ডিঙের ঠিক
সামনের রাস্তাটায়। বোলিং করছিল সায়ন দা; আর ব্যাটিং করছিলাম আমি। যেখানে স্টান্স
নিয়েছিলাম, সেখান থেকে দেখলে আমার অফসাইডে ১০ হাতের মধ্যে চার-লেনের বড় রাস্তাটা;
যেটা সোজা নিউটাউনের দিকে চলে গেছে। আর লেগসাইডে ১৫ হাতের মধ্যে আমাদের
অফিস-বিল্ডিঙের এনট্রান্স গেটের মেটাল-ডিটেক্টর। সায়ন দা’র একটা ললিপপ ফুলটস বল;
আর বলটা আমার পায়ের কাছে পড়তেই চোখ বুজে লেগসাইডে ক্রসব্যাট চালিয়েছিলাম। লক্ষ্য
ছিল, ছয় নয়; বারো মারব। চোখ খুলতে দেখেছিলাম, কেউ সামনে নেই; সবাই অফিস-বিল্ডিঙের
গেটের সামনে ছুটছিল। সায়ন দা হাত নেড়ে বলছিল, “কেলো কেস। তোর শটে একটা মেয়ে
উন্ডেড।” আমি জানি শটটায় জোর ছিল। বল ডাইরেক্ট হিট করলে ব্যাথা আছে। আমিও
দৌড়েছিলাম। মেয়েটার গলায় অন্য একটা কোম্পানির আইকার্ড ঝোলানো ছিল। ওকে ঘিরে ছিল ওর
কলিগরা। কেউ আবার জলের বোতল খুলে জল খাওয়াচ্ছিল। বলটা পড়েছিল ওর পায়ের কাছেই। আমি
স্ট্রেট গিয়ে বলেছিলাম, “সরি, বল বলটা এত দূর এসে ডাইরেক্ট আপনার গায়েই লাগবে
বুঝিনি।” কথাগুলো বলতে বলতেই আমি ওকে হাত ধরে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কোথায়
লেগেছে আপনার?”
খোঁড়াতে-খোঁড়াতে ও
বলেছিল, “পায়ে”।
আমি রীতেশকে
ইশারায় অ্যাডমিন-হেলপডেস্ক থেকে ব্যথা কমানোর স্প্রে’টা নিয়ে আসতে বলেছিলাম।
খানিকক্ষণ পর ওর পায়ে সেটা স্প্রে করে দিয়ে অপরাধীর মত বলে উঠেছিলাম, “একটু পরেই
ব্যথা কমে যাবে। আই অ্যাম সরি!”
আমাকে মনে-মনে অভিশাপ
দিয়েছিল কি না, জানি না। তবে মুখে ও বলেছিল, “নো, নো ইটস অলরাইট। আসলে ফোনে কথা
বলছিলাম তো তাই লক্ষ্য করিনি,” তারপর একটু থেমে বলে উঠেছিল, “একটু গাড়ীর
ড্রাইভারকে ডেকে দেবেন। ঐ যে লাল রঙের ইন্ডিকা’টা দাঁড়িয়ে আছে ওটা।”
আমাকে যেতে হয়নি।
আমার কলিগরাই গিয়ে ওর ড্রাইভারকে বলে গাড়ীটাকে একদম ওর কাছে নিয়ে এসেছিল। গাড়ীতে
ওঠার আগে আমি ওকে ভালো করে দেখেছিলাম। ততক্ষণে ও আইকার্ডটা গলা থেকে খুলে ব্যাগে
ঢুকিয়ে রেখেছিল। সেইজন্য ওর নামটা দেখতে পারিনি; কিন্তু ওর চোখদুটোকে খুব মন দিয়ে
দেখেছিলাম, অনুভব করেছিলাম। ২ টো গভীর চোখে ছিল শেষ বিকেলের আলো। গাড়ীটা চলে গেলেও
আমি স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়েছিলাম। রঘু এসে কানে কানে বলেছিল, “ইসকো ক্যাহতে হ্যায়
কিসমত কানেকশন।”
****
হয় এস্পার নয়
ওস্পার। দিনকয়েক হল সফটওয়্যারের চাকরি ছেড়ে টেস্ট ক্রিকেটে শিফট করেছি। টেস্ট
ম্যাচের ফিল্ডারের মতো এই আকাশী দোতলা বাড়ীটার সামনে ফিল্ডিং খাটছি। বেপাড়ায় এসে
রোদের মধ্যে টানা ফিল্ডিং দিতে দিতে জান কয়লা হয়ে গেল। তবু তার দেখা নেই, তার দেখা
নেই। আকাশী দোতলা বাড়ীর সামনে বড় লোহার কারুকাজ করা গেট। গেটের মধ্যে আর একটা
ছোট্ট কারুকাজ করা গেট। গরমে ঘামছি। কষ্টও হচ্ছে। হোক, যা হয় হবে। এস্পার নয়
ওস্পার। আজ; ডু অর ডাই।
‘ডু অর ডাই!’
বছরের শেষ কোয়ার্টারের লাস্ট ডিফেক্ট ট্রায়াগ কলের আগে আমাদের সবাইকে বলেছিল সৌরভ
দা। কিন্তু সৌরভ দা’র ভোকাল টনিক কাজে লাগেনি। সেদিনও ট্রায়াগ কলে আমি ছড়িয়েছিলাম।
তারপর থেকেই মুখ লুকিয়ে ঘুরছিলাম। প্রতিদিন সকাল ৯ টার সময় অফিস-বিল্ডিঙের সামনের
মাসির দোকানে নুডলস খেয়ে ব্রেকফাস্ট করার সময়, কিংবা সন্ধেবেলা টিমের সিনিয়রদের
সাথে আড্ডা মারার সময়... ওকে শুধু ২ টো কাজই করতে দেখি; গাড়ী থেকে নেমে অফিসে
ঢোকা, আর অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ীতে ওঠা। আমার সিনেমায় শুধু এই ২ টো শট। বাকি কিছু
শ্যুট হয়নি। হবেও না বোধ হয়। হাল ছেড়ে সেদিন ফুটপাথের ধারে বসেছিলাম। পিঠে একটা
চাপড় খেলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সুমন দা।
“যো ডর গ্যায়া সমঝো উও মর
গ্যায়া,” হাতে একটা চিরকুট নাড়তে নাড়তে গব্বর সিংহের ডায়লগ দিয়েছিল সুমন দা। আমি
ইশারায় ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, “কি ওটা?”
রীতেশ আমার দিকে তাকিয়ে
মিটিমিটি হেসেছিল।
রঘু পিছন থেকে উঁকি মেরে
বলেছিল, “তেরা কারকুইন কা পাতা চল গ্যায়া।”
রাস্তাটা ক্রস করে সোজা
গেটের সামনে গিয়ে ছোট্ট গেটটায় ধাক্কা দিলাম। ওপাশ থেকে একটা দারোয়ান গোছের লোক
বিরক্তি মাখা মুখ নিয়ে তাকাল। মাথা বাড়িয়ে মোলায়েম গলায় বললাম, “দিদিমণিকে একটু
ডেকে দেবেন।”
“কোন দিদিমণি?”
“আরে ঐ যে চাকরি করে না,
ঐ দিদিমণির সঙ্গে খুব দরকার,” লোকটাকে কনভিন্স করতে আপ্রাণ লড়ে গেলাম। লোকটা ভিতরে
ঢুকে গেল। একটু পরে ফিরে এসে জানাল, দিদিমণি বলল, “দেখা করতে পারবে না। আপনাকে
চেনে না বলছে।”
“আরে চেনে, চেনে! দেখলে চিনতে
পারবে”, মরিয়া হয়ে উঠলাম আমি।
লোকটা নির্বিকার মুখে
জানাল, ওর কিছু করার নেই।
প্রথমেই ধাক্কা।
বিরস মুখে ফিরে এলাম ফুটপাথে। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম
একদঙ্গল কালো মেঘ আকাশের মুখ ঢেকে দিয়েছে। যাক, তবু বৃষ্টি নামলে স্বস্তি। ভীষণ
গরম পড়েছে ক’দিন। সারাদিন রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। খাওয়াও জোটেনি। তবু জেদ ধরেছি,
আজ এস্পার নয় ওস্পার। মনের কথা আজ বলবই। তারপর যা হয় হবে। ভাবতে ভাবতেই দেখলাম,
লোহার গেটটা খুলে গেল। একটা লাল রঙের ইন্ডিকা গাড়ী বেরিয়ে গেল সাঁ করে। ভালো করে
লক্ষ্য করলাম, ভিতরে ও আছে বলে মনে হল না। তার মানে বাড়ীতেই আছে।
চায়ের দোকান থেকে
চা-বিস্কুট খেয়ে একটা কাগজ-পেন চাইলাম। সাদা পাতা জুটল না। সিগারেটের প্যাকেটের
ভিতরের রাংতা পাওয়া গেল, তার উল্টোদিকে লিখলাম, “আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।
প্লিজ না করবেন না, প্রতাপ।” ভাবলাম শুধু প্রতাপ লিখলে ও বুঝবে কি করে যে আমি কে?
প্রতাপ কি ব্র্যাড পিট না কি টম ক্রুজ? একটু ভেবে নামের পাশে ব্র্যাকেট দিয়ে
লিখলাম, ক্রিকেটার। খুব বোকাবোকা লাগছে। চিরকুটটা ভাঁজ করে গুটিগুটি পায়ে ফের
গেলাম গেটের কাছে। দারোয়ানটা এ বার খিঁচিয়ে উঠল, “আপনাকে বললাম না দিদিমণির সঙ্গে
দেখা হবে না। তবু আপনি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছেন।”
ওর কথা গায়ে না
মেখে মিনমিন করে বললাম, “আরে দাদা শুনুন না। এটাই লাস্ট চান্স। এই কাগজটা আপনি
প্লিজ দিদিমণির কাছে পৌঁছে দিন, দেখবেন ঠিক আমাকে চিনতে পারবে। দাদা, ডু অর ডাই
ম্যাচ, বোঝেন তো?” শেষের বাক্যটায় ইমোশন ঢেলে দিলাম। কাজ হল, লোকটা অবাক হলেও
চিরকুটটা হাতে নিয়ে ভিতরে চলে গেল।
সে দিন রঘু আমার হাতে
চিরকুটটা দিয়ে দিয়েছিল। নাম ওরা জানতে পারেনি। কিন্তু ঠিকানাটা জোগাড় করে দিয়েছিল।
ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কি করে পেলি?”
রীতেশ ভাও খেয়ে বলেছিল,
“উঁহু, দেখলে হবে, খরচা আছে।”
সায়ন দা বিজ্ঞের মত বলে
উঠেছিল, “তেরা আম খানে সে মতলব, পেড় গিননে সে কেয়া ফায়দা!”
অনেক চাপাচাপিতে রহস্যটা
ফাঁস করেছিল রঘু, “ও, মানে, কারকুইন যখন সকালে অফিসে ঢুকে গিয়েছিল, তখন গ্যারেজের
সিকিউরিটি গার্ডকে দিয়ে ওর ড্রাইভারের থেকে ওর বাড়ীর ঠিকানাটা বাগিয়েছে রীতেশ।
কিন্তু ড্রাইভারটা বলেছিল, ও নতুন। দিদিমণির নামটা ঠিক জানে না। ওকে দিদিমণি বলেই
ডাকে।”
****
“এ বার এখান থেকে না
কাটলে পুলিশ ডাকব কিন্তু!” রীতিমত হুমকি দিল দারোয়ান। আর আমার লেখা এক লাইনের
চিরকুটটা দলা পাকিয়ে আমার গায়ে ছুঁড়ে মারল। অপমানে আমার চোখ ফেটে জল এসে গেল।
গেটের সামনে থেকে সরে এসে রাস্তায় দাঁড়ালাম। দারোয়ানটা বেরিয়ে এসে বলে উঠল, “তাও
দাঁড়িয়ে আছিস। চল ফোট এখান থেকে!”
আরে, এ যে একেবারে
তুই-তোকারি করতে শুরু করেছে। রাগে, অপমানে আমার মাসল গুলো শক্ত হয়ে উঠল। আঙ্গুল
উঁচিয়ে বললাম, “পুরসভার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। এটা কারো বাড়ীর উঠোন নয়। ডাকো পুলিশ।
দিদিমণির সঙ্গে দেখা না করে আমি যাব না!”
অফেন্স ইজ দ্য
বেস্ট ডিফেন্স। দারোয়ানটা ঘাবড়ে গিয়ে গেটের ভিতরে ঢুকে গেল। আর অমনি এলোপাথাড়ি
হাওয়া জাপটে ধরল আমায়। একরাশ ধুলো পাক খেয়ে উড়ে গেল। চোখে-মুখে বালির দাপট। বুঝলাম
কালবৈশাখী। রাস্তার উল্টোদিকে চলে এলাম। একটা গাছের নিচে দাঁড়ালাম। ঝড়টা উঠতে না
উঠতেই বেশ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামলো। এ বার ধস খেলাম আমি। বৃষ্টিটা হুড়মুড় করে
নামতেই কোনওমতে একটা বাড়ীর রকে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু চোখ রাখলাম রাস্তার ওপারের
দোতলা বাড়ীটার দিকে। এলোমেলো হাওয়া চলছে। বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল
আমায়। হঠাৎ দেখি সেই দারোয়ানটা ছাতা নিয়ে এসে আমায় ডাকছে। আমি কি ভুল দেখছি? না,
লোকটা আমাকেই হাত দিয়ে ডাকছে। আমি দৌড়ে গিয়ে ওর ছাতার নীচে দাঁড়াতেই ও বলে উঠল,
“আপনাকে দিদিমণি ডাকছে।” অসংখ্য ফ্লাড লাইট যেন একসঙ্গে জ্বলে উঠল। সেই আলোয় ভাসতে
ভাসতে আমি এগিয়ে গেলাম আকাশী দোতলা বাড়ীটার দিকে......
“সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে
আসুন প্লিজ”-আড়াল থেকে ভেসে এল অচেনা নারী-কণ্ঠস্বর। নির্দেশ মেনে সন্তর্পণে
দোতলায় উঠলাম। সামনে প্রশস্ত ড্রয়িং। দামি আসবাবে সুসজ্জিত। “দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?
বসুন।” সেই একই গলা। তবে এবারও আড়াল থেকে ভেসে এল। গলার মালকিনকে দেখতে পেলাম না।
আমার গায়ে বৃষ্টির জল। মাথাও ভেজা। সোফায় বসব কি না ভাবছিলাম।
“কী হল দাঁড়িয়ে কেন?
বসুন।”
ঘরের মধ্যে কোনও আলো
জ্বালানো নেই। বৃষ্টি ভেজা বিকেলের আলো চুঁইয়ে পড়ছে ঘরের ভেতর। পরিষ্কার করে কিছু
দেখা যাচ্ছে না। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার বাঁ দিকে ২ টো ঘর। ২ টো ঘরেরই দরজা
বন্ধ। আমার সোজাসুজি একটা বারান্দা। কাঁচের স্লাইডিং ডোর দেওয়া। একটা পাল্লা খোলা।
সেখান দিয়ে জোলো হাওয়া ঢুকছে। দেখতে পাচ্ছি বৃষ্টির তোড়। আর একজনকেও দেখতে পাচ্ছি।
তবে সিল্যুট। বাইরের দিকে তাকানো। আমার দিকে পিছন ফেরা। একজন কাজের মহিলা নিঃশব্দে
ঘরে ঢুকে আমার হাতে একটা তোয়ালে ধরিয়ে সামনের টেবিলে একপ্লেট মিষ্টি রেখে চলে গেল।
“মাথাটা মুছে নিয়ে
মিস্টিগুলো খেয়ে নিন। তার পর কফি দিতে বলছি”, ফের ভেসে এল নির্দেশ।
মাথাটা ভয়ে ভয়ে মুছে নিয়ে
ভয়ে-ভয়ে সোফায় বসলাম।
“কেন এমন পাগলামি করছেন
বলুন তো? শরীর খারাপ হলে কি হবে শুনি?” এবার গলার স্বর অনেক আন্তরিক। ঘরে আলো কম।
ছায়ামূর্তির মত লাগছে ওকে। অনেক কথা বলতে চাই, কিন্তু কিছুই বলে উঠতে পারছি না।
গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে। শব্দগুলো কিছুতেই ঠেলে বেরতে পারছে না। তবে ভয়টা
আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে আমার। “কী হল উত্তর দিচ্ছেন না কেন? এ ক’দিন তো বাড়ীর
সামনে গোয়েন্দাদের মত দাঁড়িয়ে ছিলেন। আজ তো আবার আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য বিস্তর
নাটক করলেন। আর এখন মৌনীবাবা সেজে রয়েছেন!” ধমকের সুরেই কথাগুলো বলল ও।
না, এবার সব বলে
ফেলতে হবে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। সামনে স্লো শর্টপিচ বল। এই বলে ছয় না মারতে পারলে
আর আমার জীবনে ছয় মারা হবে না। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে স্টান্স নিলাম। দুদ্দাড় করে
বলে ফেললাম, “আমি না একদম কাজ করতে পারছি না। ডেস্কটপে শুধু আপনাকে দেখতে পাই।
অ্যাপ্লিকেশন ডিফেক্ট তো দুরঅস্ত, পাতি ইউ. আই. ডিফেক্টও চোখে পড়ে না। সৌরভ দা’র
কাছে খিস্তি খাই। কলিগরা খিল্লি করে...”
আরও অনেক কিছু ভুলভাল ভাট্
বকতে যাচ্ছিলাম। একটা কাঁচভাঙা হাসি আমায় থামিয়ে দিল। আর অমনি আধো অন্ধকার ঘরে
হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল জলভরা মেঘের দল। নূপুর পরা বৃষ্টিরা হেঁটে গেল ঘরের মধ্যে
দিয়ে। “বুঝেছি, সেদিন আমাকে দেখতে গিয়েই ওরকম একটা স্লো শর্টপিচ বলে বোল্ড
হয়েছিলেন, তাই তো? আমি তো উইকেটের সোজাসুজিই দাঁড়িয়ে ছিলাম। অফিস ফেরত দেখছিলাম
ম্যাচটা।”
আমি আপত্তি করার আগেই ও
বলে উঠল, “সচিন, বিরাট কোহলি-রা ও অবশ্য বাজে বলে আউট হয়।”
আমি বুঝতে পারলাম ও ‘গালি
ক্রিকেট’এর ফাইনাল ম্যাচটার কথা বলছে। মনে করার চেষ্টা করলাম সে দিন ও মাঠে ছিল না
কি? কই, না, দেখতে পাইনি তো। আমি না পেলেও কলিগরা তো নিশ্চয়ই দেখতে পেত।
“সকালে অফিস আসার সময় আমি
তো আপনাকে প্রায়ই দেখি সামনের গুমটিটাতে ব্রেকফাস্ট করতে। তখন তো এমন ভাব করেন যেন
ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না”, কথাগুলো বলতে বলতে ও আমার কাছে চলে এল। সুইচ
টিপে আলো জালালো। সাদা আলোয় ভরে উঠল ঘরটা।
“বৃষ্টি পড়লে আমি ঘরের
আলো নিভিয়ে বাইরের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকি। আপনার বৃষ্টি ভালো লাগে না?”- আমার
উল্টোদিকে বসে প্রশ্নটা করল ও।
আলোয় চোখ সয়ে আসার পর মুখ
তুলে তাকাতেই ঝটকাটা খেলাম। ঝটকা বলে ঝটকা? একেবারে হাইটেনসন লাইনের শক! বোধবুদ্ধি
সব লোপ পেয়ে গেল। ফ্যাল-ফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
“ইশ! ওভাবে কি দেখছেন?
আমি কি ভূত না কি?”- একটা ফর্সা মুখ আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এল, “আরে আমি
অয়ন্তিকা।”
“আমার সঙ্গে দেখা করার
জন্য তো হেদিয়ে মরছিলেন। আর এখন ময়দানের গোষ্ঠ পালের মূর্তি হয়ে গেলেন কেন?”
আমার পালস রেট কমছে।
হাতের তালু, পায়ের পাতা ঘামছে। সব ভোকেবুলারি ডিলিট হয়ে গিয়েছে সিস্টেম থেকে। এ
কাকে দেখছি? এ তো সে নয়! এ তো অন্য কেউ। সর্বনাশ! কার বাড়ীতে ঢুকে পড়লাম আমি?
“আর বাহাদুরি দেখাতে হবে
না মিস্টার গোমড়াথোরিয়াম। এ বার সোজা বাড়ী যাবেন। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধাবেন না
আবার।”
কোথা থেকে কি হয়ে
গেল, আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। দেখছি অয়ন্তিকা অনেক কথা বলে যাচ্ছে। যেন আমি
ওর অনেকদিনের চেনা। অথচ, আমি ওকে বলতে পারছি না, যে আমি ওকে চিনি না। আমি ওর কাছে
আসিনি। ওর জন্য এত কাঠখড় পোড়াইনি আমি। সব খুলে বলার চেষ্টা করেও কথাগুলো গুছিয়ে
উঠতে পারলাম না। দেখলাম ও আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। হাসলে গালে টোল পড়ে।
ওর চোখ দু’টো বাদামি। কনট্যাক্ট লেন্স কি না কে জানে?
হাবাগোবার মতো বসেছিলাম।
জীবনে এমন কেস খাইনি। মাথা কাজ করছে না। হঠাৎ খেয়াল হল পকেটে মোবাইল তির-তির করে
কাঁপতে কাঁপতে বাজছে। ফোনটা তুলতেই ও’পাশ থেকে রীতেশ উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল,
“প্রতাপ, পুরো কেলো কেস। তুই কোথায়?”
অয়ন্তিকা আমার দিকে
তাকিয়ে আছে। অস্বস্তি হচ্ছিল ওর সামনে কথা বলতে। নিচু স্বরে বললাম, “কেন কি
হয়েছে?”
“আরে তোর কারকুইনের
ড্রাইভারটা তো বড় ঘাপলা করে দিয়েছে!” রীতেশের গলায় টেনশন। “ক্যালানে’টা সেদিন ভুল
ঠিকানা দিয়েছিল। বাড়ীর নম্বরটা গণ্ডগোল করে ফেলেছে... হ্যালো, শুনতে পাচ্ছিস...”
আর শুনে কি হবে? এবারও
স্লো শর্টপিচ বলেই বোল্ড। ফোনটা কেটে দিয়ে পকেটে রাখলাম।
অয়ন্তিকা ভুরু কুঁচকে
জিজ্ঞাসা করল, “এনি প্রবলেম?”
“না না, এমনি বন্ধুদের
ফোন ছিল,” হাসার চেষ্টা করলাম। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “এ বার যাই।”
“যাই মানে? আবার নাটক!
মিষ্টিগুলো কে খাবে শুনি?”-কোমরে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল অয়ন্তিকা। ফের ধমক দিয়ে বলে
উঠল, “চুপ করে বোসো। একদম নড়বে না! না’হলে কিন্তু খুব রাগ করবো!”
একজোড়া টানা-টানা বাদামি
চোখের কড়া শাসন। ঘাবড়ে গিয়ে ফের সোফায় বসে পড়লাম। ভাবলাম সৌরভ দা’ও ডিফেক্ট মিস্
হলে এত ধমকায় না আমায়...!!
-----------
No comments:
Post a Comment