****
“কি কিক...!! কি কিক কিক!!” কেউ খুব জোরে গাড়ির হর্ন বাজাচ্ছে। গালে শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল নিয়ে আনমনা হয়ে
রান্নাঘরের জানলা দিয়ে উঠোনের দিকে তাকিয়ে ছিল রুপালি। গাড়ির হর্নটা ওদের বাড়ির সামনেই বাজছে; বুঝে ওঠার সাথে সাথেই রাস্তার দিকের বারান্দায় চলে আসে..
এতো সকালে হঠাৎ কে এলো!!
“কি কাকিমা!!
গাড়িটা কি তোমাদের গেটের সামনেই রাখবো?”
গলার আওয়াজটা
বেশ চেনা চেনা লাগে রুপালির।
“আর বলো, কেমন আছো তোমরা?” গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বার করে এই কথাটা জিজ্ঞেস করার সময় রুপালি চেনার
চেষ্টা করে মানুষটাকে।
“হ্যাঁরে!! দিপু
না?”
“যাক বাবা!!
চিনতে পেরেছো তাহলে!! বাড়িতে সব ঠিকঠাক?”
“হ্যাঁ!! ওই চলে
যাচ্ছে। আগে থেকে জানিয়ে আসতে পারতি।”- বুকের ভেতরটা দুঃখে ফেটে গেলেও হতাশা আড়াল করার
আপ্রাণ চেষ্টা করে রুপালি।
“আরে তোমাদেরকে
আবার জানিয়ে আসতে হয় নাকি! এই নাও, এটা তোমার জন্য”- হাতের পলিব্যাগটা রুপালির দিকে এগিয়ে দেয় দিপু.. “আর!! কাকু
কোথায়? দেখতে পাচ্ছিনা যে!!”
“তোর কাকু গেছে
বাজারে। চলে আসবে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে....”- মিথ্যে কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে
মোবাইলটা হাতের কাছে টেনে নেয় রুপালি। যদি তরুণকে দিপুর আসার কথা জানালে একটু
তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে পারে। সত্যি এত ঝড়ঝাপ্টা পেরিয়ে এসেও ছেলেটা ওদের নিজের লোক
ভাবে, গ্রামের লোকেরা সত্যি খুব সরল আর ঋণী হয়.. মনে মনে ভেবে ওঠে রুপালি।
“হ্যাঁরে দিপু, এইটা তো চায়ের প্যাকেট মনে হচ্ছে। কিন্তু এটা কি ভাষায় লেখা?”
“আরে কাকিমা
ভুলে গেলে হবে!! প্রথম যখন মায়ের সাথে ভাড়া থাকার কথা বলতে এসেছিলাম বছর সাতেক আগে, তুমিই তো মায়ের কাছে গল্প করেছিলে! তোমার সিঙ্গাপুরের লাক্সারি চা
খাবার খুব সখ ছিল.. তো এই বছর যখন আমাকে অফিস থেকে ওখানে পাঠালো, ভাবলাম তোমার জন্য নিয়ে আসি!!”
দিপু একটানা
কথাগুলো বলে গেলেও রুপালি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না!! সত্যিই
ছেলেটা ওদের জন্য এখনো এত ভাবে!!
****
“৪৬/২, উত্তর পঞ্চান্নগ্রাম, কলকাতা-২৬.. হ্যাঁরে মনা, এই বাড়িটাই তো মনেহচ্ছে.. দেখতো ঠিক দেখছি কি না?”-ছোটবেলা থেকেই দিপুর মা ওকে মনা
বলে ডাকে।
“হ্যাঁ মা, একদম ঠিক আছে।”- মায়ের কথায় সায় দেওয়ার সাথে সাথে দিপু কলিংবেলটা বাজিয়ে দেয়।
“আজ্ঞে, রামপুরহাট থেকে আসছি। সুবলকাকা পাঠিয়েছেন। আপনি রুপালি কাকিমা তো?”- দরজাটা খোলার সাথে সাথে
চোখেমুখে একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে দিপু বলে ওঠে।
“আসুন, ভিতরে আসুন!!”- রুপালি দিপু আর ওর মা’কে ঘরে ডেকে নেয়।
সুবল রুপালিদের বাড়িতে
এসেছিলো কাজের লোক হয়ে; তখন রুপালির শ্বাশুড়ির একেবারে শয্যাশায়ী অবস্থা, তাও আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে।
এসেছিল শুধু ওর সাধের বুড়ি’মার কাজগুলো রুপালির সঙ্গে ভাগ করে নিতে। প্রথমে বুড়ি’মাকে স্নান করানো, খাওয়ানো আর কাপড় কাচার দায়িত্ব বর্তেছিল ওর উপর। কিন্তু ওর এই সব কাজকে খুব
নিপুণভাবে করার গুণের জন্য, রুপালিদের ওর ওপর নির্ভরতা কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রথমদিন
কাজে এসে একজন অচেনা মানুষকে বুড়ি’মা বলে ডেকে নেওয়াই হোক, বা ওর নিজের সব কাজ শেষ করে ওঠার পর নিজে থেকে রুপালিকে বাড়ির কাজে সাহায্য করার
মনোভাবের জন্যই হোক, কাজে আসার এক’দুমাসের মধ্যেই সুবল বাড়ির কাজের ক্ষেত্রে; রুপালিদের জন্য হয়ে উঠেছিল ওয়ান
স্টপ সলিউশন। বুড়ি’মা মারা যাবার পরও, তরুণ আর রুপালি চেয়েছিল সুবল ওদের বাড়িতে থেকে যাক। কিন্তু সুবলের আর মন চায়নি, বুড়ি’মার সাথে ও এতটাই একাত্ম হয়ে
গেছিলো যে, বুড়ি’মা না থাকাতে ওর কাছে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়াটাই একমাত্র পথ বলে মনে হয়েছিল। তবে ফিরে যাবার সময় তরুণ ওকে কথা দিয়েছিল যে; কোনোদিন যদি ওদের তরফ থেকে কোনো সাহায্যের দরকার হয়, সুবল যেন ইতস্তত না করে!!
তো এবার যখন
সুবলের ভাইপোর কলকাতার সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অ্যাডমিশন হল, কলেজ হস্টেলের বদলে ওকে তরুণদের বাড়িতে রাখাটাই
সুবলের কাছে বেশি শ্রেয় মনে হয়েছিল। ব্যাপারটা তরুণকে জানাতে ও আপত্তি তো করেইনি, উল্টে খুশীই হয়েছিল; কারণ ও দিপুর বাবার অসুস্থতার ব্যাপারে আগেই সুবলের থেকে শুনেছিল।
****
“একেবারে নিশ্চিন্ত থাকুন বৌদি, আপনার ছেলে তো আমারও ছেলের মতই! ভেবে নিন ও নিজের বাড়িতেই থাকবে!”- রুপালির কথায় দিপুর মা বেশ খানিকটা আশ্বস্ত হয়।
“হ্যাঁ, সে আরে বলতে! সে সব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। সুবল’দা তো প্রায় সবসমময় বলে আপনাদের
কথা। কিন্তু ভাড়াটা কত দিতে হবে সেটা তো
এখনো জানালেন না....”- ব্যাগ থেকে নাড়ুর বোতলটা বার করে দিপুর মা রুপালির দিকে
এগিয়ে দেয়।
“আরে ধুর!
নিজেদের লোকেদের মধ্যে আবার ভাড়া কিসের? সুবলের ভাইপো থাকতে আসবে জানতে
পেরেই আমি গেস্ট রুমটা ফাঁকা করে দিয়েছি। ৪ টে বছর ও এখানেই থাকুক আর পড়াশুনা করে
খুব ভালো মানুষ হোক; সেটাই চাই। চা খাবেন তো দিদি?”- নাড়ুর বোতলটা রান্নাঘরের বাঙ্কে রেখে রুপালি প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় দিপুর
মায়ের দিকে।
“সত্যি! কি বলে যে আপনাদের ধন্যবাদ জানাবো। আসলে ওর বাবা সেরিব্রাল স্ট্রোকে
শয্যাশায়ী হয়ে যাবার পর থেকে আমিই ওকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। হস্টেলে মানিয়ে
নিতে পারবে কিনা সেই নিয়ে দোটানায় ছিলাম.... এত সহজে ব্যাপারটা মিটে যাবে ভাবতেই
পারিনি....সব আপনাদের জন্য”- কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে দিপুর মায়ের গলায়।
“আরে ছাড়ুন তো!!
নাড়ুগুলো খুব সুন্দর খেতে। মেয়ে টিউশন থেকে ফিরলে একাই সবকটা
খেয়ে নেবে মনে হয়। চা বানাচ্ছি তাহলে!!”- রুপালি বলে ওঠে।
“গুগলির তো নাড়ু
খুব পছন্দের; সেইজন্যই তো ওর সুব্বাইকাকা এইগুলো দিয়ে পাঠিয়েছে। যাই হোক, আপনার যখন তখন চা খাবার অভ্যেসটা এখনো যায়নি দেখছি। সুবলদা বলে যে, আপনার চা খাবার কোনো নির্দিষ্ট
সময় নেই.. তাই বলে এই ভরদুপুরে!!”- খানিকটা অবাক হয়েই দিপুর মা বলে রুপালিকে।
“হ্যাঁ, তা যা বলেছেন। খাবার খাই কি না খাই, দিনে অন্তত ৫ বার চা না খেলে আমার চলে না। দার্জিলিং-আসাম থেকে শুরু করে নীলগিরি-মুন্নার অবধি পুরো দেশের চা আমার টেস্ট করা হয়েগেছে। এবার একটু দেশের বাইরের
চা চেখে দেখার খুব ইচ্ছে হয়; বিশেষত সিঙ্গাপুরের চা। টেস্ট, ঝাঁঝ.... সবটাই পুরো আলাদা শুনেছি। আপনার দাদাকে সেই কবে থেকে বলছি এনে দেবার জন্য, পাত্তাই দেয় না..”- কথাগুলো বলার পর রুপালি নিজেই হেসে ওঠে, দিপুর মা’ও তাতে যোগ দেয়।
****
“কি গো!!
বলেছিলে দেরী হলেও অন্তত সাড়ে দশটার মধ্যে চলে আসবে। এখন রাত্রি ১২ টা বাজছে.. এতক্ষণ সময় লেগে গেল?”- তরুণের হাত থেকে অফিসের ব্যাগটা নিয়ে প্রত্যুসা; মানে তরুণের সাধের গুগলি প্রশ্নটা
ছুঁড়ে দেয় ওর দিকে।
“আর বলিস না মা!
আপিসের বড়বাবুর মেয়ের বিয়ে, হঠাথ করে কিভাবে ছেড়ে আসি বল তো? তাই সবাই একসাথেই বেরলুম। তবে পাত্রকে যা দেখতে হয়েছে না.. উফ!!কি ফর্সা, গ্ল্যামার একেবারে চুইয়ে পড়ছে। তার উপরে আবার বড় ডাক্তার.. দেখিস একদিন এরকম কোনো ছেলের সাথেই আমি আমার
গুগলিরও বিয়ে দেব”- একটানা কথাগুলো বলে থামে তরুণ; শেষের দিকে ওর কথাবার্তায় গুগলি প্রচুর উথসাহ দেখতে পায়।
“বা রে!! তুমি
আমার বাবা হয়ে আমার পছন্দ কি সেটা জিজ্ঞেস না করেই এইভাবে বিয়ে দেবার কথা ভেবে
ফেলছ.. বলিহারি তোমার”- তরুণের কথা যে ওর খুব একটা পছন্দ হয়নি, সেটা গুগলি কথা বলার ভঙ্গিমাতে বুঝিয়ে দেয়।
“আচ্ছা হয়েছে। খাবারদাবারের কি কিছু ব্যাবস্থা হয়েছে নাকি? জানিস তো বিয়েবাড়ির খাবার আমার আবার মুখে রোচে না, কফি ছাড়া আমি কিছুই খাইনি!!”
“হবে না আবার!!
দিপু বাড়ীতে থাকলে আবার এইসব ব্যাপারে কাউকে চিন্তা করতে হয় নাকি!! গত ৫ দিন ধরে
তো মায়ের জ্বর হবার পর থেকে ও’ই রান্নাঘরের দখল নিয়ে নিয়েছে। সকালে মায়ের মাথায় জল পোটলা দেওয়া থেকে ওর দিন শুরু হয়, বিকেলে কোচিং থেকে ফেরার পর আমাকে চাউ বানিয়ে দেওয়াই হোক আর রাত্রে তুমি দেরি
করে ফিরবে যেনে তোমার জন্য ডালসেদ্ধ দিয়ে আলুভাতে রান্না করে রাখাই হোক, সবকিছুই ও’র খেয়ালে থাকে”- একটানা কথাগুলো বলে ওঠে গুগলি; ও’র কথাতে দিপুর প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরে
পড়ে।
“সত্যি রে!!
ছেলেটা পুরো ওর কাকার মত হয়েছে; বোঝাই যায় না যে মাত্র দেড় বছর আগে ও আমাদের সঙ্গে থাকতে এসেছিল।”-স্বগতোক্তির স্বরে কথাগুলো বলতে বলতে রান্নাঘরের
দিকে ভাতের থালাটা নিয়ে এগিয়ে যায় তরুণ।
দিপুর এই সবাইকে
নিয়ে; সবার কথা ভেবে চলার ক্ষমতাটা প্রত্যুসাকে একদিকে যেমন বড্ড অবাক করে, অন্যদিকে খানিকটা আকৃষ্টও করে!! ছেলেটা একেবারেই ঘাড়গোঁজা পড়ুয়া নয় যে শুধু নিজের ইঞ্জিনিয়ারিং এর পড়াশোনা
নিয়ে থাকে, আবার মতলবি ও নয় যে শুধু প্রত্যুসা রিকোয়েস্ট করলে সারারাত ধরে ওর অ্যাসাইনমেন্টের
আঁকাগুলো দায়িত্ব নিয়ে এঁকে দেয়; যখনই বাড়ীর কোনো কাজ ওদের ৩ জনের পক্ষে সামলে ওঠা সম্ভব হয় না, তখন না বলতেই ঠিক কোনোভাবে নিজে থেকে হেল্প করতে হাজির হয়ে যায়। সেটা মায়ের জ্বর থাকতে রান্নাঘরের পুরো দায়িত্ব নিয়ে
নেওয়াই হোক, ওর নিজের কোচিং থেকে ফিরতে রাত হলে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে
থেকে দায়িত্ব নিয়ে ওকে বাড়ীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসাই হোক, বা রাতে বাবার ফিরতে ফিরতে ও আর
মা ঘুমিয়ে পড়লে বাবাকে খাবার গরম করে দিয়ে বাসন ধুয়ে গুছিয়ে রাখাই হোক.. কোনো কাজ
করার সময়েই দিপু কখনও নিজের স্বার্থ দেখে না। নিজের পড়াশোনাটাও ঠিক ফাঁকতালে ম্যানেজ করে নেয়।
হয়তো ওর
সুব্বাইকাকাও এই ধরণেরই ছিল; কিন্তু ঠাম্মি মারা যাবার পর যখন সুব্বাইকাকা ওদের বাড়ী থেকে চলে যায়, তখনো তার সাধের গুগলির বয়স সবে মাত্র তিন। তো ওর মা-বাবা একজন মানুষের এই
ধরণের ক্ষমতা সম্পর্কে সুব্বাইকাকার দরুণ খানিকটা ওয়াকিবহাল থাকলেও সজ্ঞানে কাউকে
এমন নিঃস্বার্থভাবে সবার জন্য খাটতে দেখাটা গুগলির কাছে একেবারেই নতুন; আর সেইজন্যই হয়তো যত দিন যায়, ও দিপুর প্রতি মানসিক ভাবে আরও আকৃষ্ট
হতে থাকে!! ওর মনে হতে থাকে, যদি ও’কে আর ওর মা বাবাকে কেউ নিজের ভেবে সারাজীবন খুশী রাখতে পারে, তাহলে সেটা দিপুই!!!!
****
নাহ আর থাকতে
পারছিল না প্রত্যুসা। মনের কথাটা দিপুকে না জানালে কেমন একটা দমবন্ধ ভাব আসছিল নিজের মধ্যেই। প্রায় একমাস বলব কি বলব না এই দোটানায় থাকতে থাকতে শেষ
পর্যন্ত ঠিক করে নিলো যে যাই হোক, এই শুক্রবার দিপুকে ও’র মনে কি চলছে সেটা জানাতেই হবে।
যেই ভাবা সেই
কাজ। সোজা দিপুর কলেজের গেটের সামনে পৌঁছে দিপুর মোবাইলে ফোন লাগিয়েছিল ও।
থারমোডায়নামিক্সের
ক্লাসটা সবে শেষ হয়েছে। অসময়ে হঠাথ মোবাইলে প্রত্যুসার ফোন আসতে দেখে দিপুও খানিকটা অবাক হয়ে গিয়েছিল।
“হ্যালো
প্রত্যুসা!! হঠাথ এখন ফোন করছো? বাড়ীতে সব ঠিক আছে তো?”
“শোনো, তোমাকে একটা কথা বলব?”
“হ্যাঁ বল”- দিপু তখনও
ফোন করার আসল কারণটা বুঝে উঠতে পারেনি।
“এই রবিবার বিকেলে একবার আমার সঙ্গে গড়িয়াহাট
লেকে দেখা করতে আসবে?”
প্রত্যুসার মুখে
হঠাথ এমন প্রস্তাব শুনে প্রথমটায় খানিক ঘাবড়ে গিয়েছিল দিপু। কিন্তু কথার
এক্সপ্রেশনে তা বুঝতে না দিয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিল, “হঠাৎ বাড়ীর বাইরে
তোমার সঙ্গে দেখা করতে যাবো কেন? বাড়ীতে তো সবসময়েই দেখা হচ্ছে।”
“আমি তোমার কলেজের ৪ নম্বর গেটের
সামনে দাঁড়িয়ে আছি। যেটা জানতে চাইছো সেটা মুখোমুখি এসে কথা বললে বেটার বোঝাতে পারতাম।”-বলে মুচকি হাসি।
দিপু ৪ নম্বর গেটের সামনে পৌঁছেছিল,
সুজয়ও সঙ্গে ছিল- “হ্যাঁ; এবার দেখা করার
কারণটা বলবে?”
“আসলে তোমার সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছা করে,
তাই।”
“কি কথা?”
“এখন বলতে ইচ্ছে করছে না। সেদিন এলে বলব।”
“মনে হয় সম্ভব হবে না”, আসল ব্যাপারটা আন্দাজ
করতে পেরে একটু বিরক্ত হয়েই বলে উঠেছিল দিপু।
“বেশ তো। সম্ভব মনে হলেই না হয় এসো, আমি
অপেক্ষায় থাকবো”, বলে আবার সেই সুন্দর হাসিটা ছড়িয়ে দিয়ে ও’খান চলে গিয়েছিলো প্রত্যুসা। দিপু ঠিকই করে
নিয়েছে, যাবে না। কিন্তু সেদিন বাড়ী ফিরে রাতে বিছনায় ছটফট। ‘অপেক্ষায় থাকবো’ শব্দটা
এত বিচ্ছিরি যে, মাঝের দিনটা ভীষণ অন্যমনস্ক কাটিয়ে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হাফিয়ে
উঠে, শেষ পর্যন্ত রবিবার বিকেলে দিপু গিয়েছিল প্রত্যুসার সঙ্গে দেখা করতে। মনে-মনে ঠিকই করে রেখেছিল, মেয়েটা ন্যাকা
ন্যাকা ভাবে প্রেম নিবেদন করলেই সটান ‘না’ বলে দিয়ে চলে আসবে। কিন্তু ফরসা, রোগা, মাঝারি
হাইটের মেয়েটা একবারের জন্যেও ওইসব কথা উচ্চারণ করেনি। বরং ওরা ২ জনে মিলে লেকের ধারে টানা দেড় ঘন্টা
হেঁটেছিল। কত গল্প, কত সহজ মজা, মনেই হয়নি এতক্ষন সময় কি ভাবে পার হয়ে গিয়েছিল।
হাঁটতে হাঁটতে সেদিন রোজকার চেনা রাস্তাগুলোও মনে হচ্ছিল অচেনা। সুজয় খবর পেয়ে
গিয়েছিল পরের দিনই। কলেজে ঢোকার সাথে সাথেই ছুটতে ছুটতে
এসেছিল দিপুর কাছে, “কি রে, শেষ পর্যন্ত প্রত্যুসার জন্যই;
এন্নি সোনি কিউ, ল্গগে তু ম্যায়নু,
ম্যায় তেরা হো গেয়া, হোজা মেরি তু.. গাইবি??”
“কি বাজে বকছিস!”
“না না আর ঢপ দিয়ে লাভ নেই বস। কাল পুরা দুনিয়া
দেখা হ্যায়, শোলা অউর শবনম, দোনো কো এক সাথ।”
“তো কি হয়েছে? কথা বলেছি শুধু।”
“ব্যস ব্যস, এই কথা কদ্দুর এগোবে আমার ভালোমতো
জানা আছে।”
“কিছুই এগোবে না দেখে নিস।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুজয়ের কথাই সত্যি
হয়েছিলো। সেদিন বিকেলের শুরু হওয়া কথা চলতে-চলতে প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, আর ফুরল
না।
কলেজ ক্যাম্পাসিং এ যেদিন মাল্টিন্যাশনাল
অয়েল কোম্পানির এপ্যাক হেড অফিসের অফার লেটারটা পেয়েছিল, সেদিনই সন্ধেবেলা প্রত্যুসার সঙ্গে দেখা
হওয়ার পর থেকে খুব টেনশনে ছিল দিপু। চাকরি পাওয়ার কথাটা বারবার বলতে গিয়েও মুখে আটকে যাচ্ছিল।
শিয়োর ছিল, পাগলিটা যেই শুনবে এই চাকরির জন্য আর রোজ ওদের দেখা হবে না, অমনি
বলবে, না না এ চাকরি করতে হবে না। অন্য চাকরি খোঁজো। দুরুদুরু বুকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যুসাকে জানানোর পরই প্রত্যুসা উচ্ছসিত।
এমনকি, এরপর রোজ যে আর দেখা হবে না, সে কথা জানার পরও একইরকম খুশী। দিপু বলেই ফেলেছিল,
“তার মানে, তোমার কষ্ট হবে না! আমাদের কিন্তু এরপর থেকে আর রোজ দেখা হবে না!”
“কি আর করা যাবে বলো? চাকরি তো তোমাকেই করতে
হবে। ব্রাইট কেরিয়ার। আমার অবস্থা তো তোমার জানাই আছে। খুব বেশী হলে তোমার বিদেশের
বাড়ীর রান্নাঘরে খুন্তি নাড়বো, হা হা হা!”
দিপু হাসেনি। শুধু
খুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিল প্রত্যুসার মুখের দিকে।
****
বিকেলে দেশপ্রাণ শ্বাসমল রোড ধরে
হাঁটছিল দিপু আর প্রত্যুসা। সদ্য চাকরি থেকে একমাসের ছুটিতে দেশে ফিরেছে দিপু। প্রত্যুসার
কুর্তিটা ধরে দিপু বলল, “এবার প্লিজ তোমার এই পুরনো মালটাকে ফেলবে?
অনেকদিন আগেই এটাকে ঘরমোছার ন্যাকড়া বানিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিলো।”
“বেচারার বয়স হয়েছে বলে যা খুশী তাই বলাটা ঠিক
নয়। এটাই তো সেই কুর্তি যেটা পরে আমি প্রথমবার নির্লজ্জের মত তোমাকে প্রপোজ করতে
গিয়েছিলাম।”
“ঠিক আছে তা হলে একটু ভালো করে আয়রন করিয়ে নাও। আমি করিয়ে দেবো কি? কি বিচ্ছিরি ভাবে রুইগুলো
অবধি বেরিয়ে গেছে, ইস!”
“না না আমিই এবার করে ফেলব। আজ লাইক অ্যাপে একটা ভিডিও আপলোড করেছিলাম;
প্রচুর ফিল্টার দিয়ে.. অনেক ভিউ এসেছে.. মনে হচ্ছে এটার জন্য একটা বেশ মোটা
পেমেন্ট পাবো!!”
“নাচগানের ভিডিও এই লেভেলে অনলাইনে আপলোড করছো আজকাল!” ভুরু
কুঁচকে তাকালো দিপু।
“উপায় কি? পাবলিক ডিমান্ড যখন, তখন তো করতেই
হবে; এত ভাবলে চলবে?”
“কি, পাবলিক ডিমান্ড নাকি? সে আবার কি?”
“এই রে, না-না কিছু না,”জিভ কাটল প্রত্যুসা।
“কি যে বলো সব। অর্ধেক বুঝি না।”
“যাক গে, বাদ দাও, বাচ্চা ছেলে অত বুঝে কাজ
নেই,”বলে মুচকি হাসল প্রত্যুসা।
“হুম, আমি বাচ্চা? লজ্জা করে না তোমার বাচ্চা ছেলের সঙ্গে প্রেম
করতে?”
“হ্যাঁ, করে তো। সেই জন্যই দেখো না কিরকম লজ্জা
পেয়ে থাকি তোমার কাছে!”
“এক ঘুসি মারবো। পাগলি কোথাকার!
ফর্মটা তুলেছিলে?”
“কোন ফর্ম? ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ, এস বি আই ক্লারিকাল তো? কবে তুলে
নিয়েছি। ফিলাপও হয়ে গিয়েছে। শুধু ওই ডি ডি টা বানানো বাকি। মাইরি, দু’শো টাকা
হেব্বি গায়ে লাগছে।”
“ঠিক আছে, আমি দিয়ে দেবো। আপনি শুধু দয়া করে
ফর্মটা জমা করুন।”
“আরে, না না, তুমি কেন দেবে? আমি এমনিই বললাম।
এই সপ্তাহেই জমা করে দেবো।”
“এই সপ্তাহেই জমা করবে? আচ্ছা, লাস্ট ডেট কবে
জমা দেওয়ার?”
“এই তো, এই উইকেই,” স্মার্টলি বলল প্রত্যুসা।
“উফ, ভগবান বেছে বেছে কেন যে আমার কপালেই এমন
একটা মেয়েকে জোটাল!” কপালে হাত রেখে বলল দিপু।
“কেন আমি আবার কি করলাম?”
“ফর্মটা জমা দেওয়ার লাস্ট ডেট আগামীকাল। তুমি
ভুলে গিয়েছো, অথচ আমার মনে রয়েছে, আশ্চর্য!”
“আরে কি মুশকিল, আগামীকাল তো এই সপ্তাহের ভিতরেই
পড়ে, নাকি?”
“প্লিজ, আমাকে আর টুপি পরিও না। দয়া করে কাল
জমাটা দিয়ো, কৃতার্থ হব। আর প্রিপারেশন নিচ্ছ কিছু? নাকি শুধুই..”
“ওরে বাবা, এবার ছাড়ো না এসব কথা,” অধৈর্য হয়ে
বলল প্রত্যুসা। “একে তো তুমি ৬ মাসে একবার কলকাতায় এলে এইটুকু সময়
দেখা হয়, সেইটুকু টাইমেও যদি তুমি মাস্টারগিরি করো, তাহলে আর প্রেম করবো কখন?”
“ও তা-ই? বেশ এবার থেকে আর কোনওদিন কিচ্ছু
জিজ্ঞেস করব না দেখো।”
“এই মরেছে, আমি কি বললাম, আর তুমি কি মানে করলে!
যাক গে, বলো, তোমার অফিসের খবর কি?”
“ঠিকই আছে।”
“আচ্ছা, তোমার ডিপার্টমেন্টে কি সবাই ছেলে, নাকি
মেয়েও আছে দু’একজন?”
“না, বেশ কয়েকজন ফরেনার মেয়ে আছে এবং
প্রত্যেকেই সেক্সি, বুঝলে? তোমার মত ন্যালা-ক্যাবলা নয়।”
“হুম বুঝিলাম।”
“হি হি হি জেলাস-জেলাস,” দিপুর হাসি শুনে
রাস্তায় হাঁটতে থাকা অচেনা দু’জন লোক ফিরে তাকাল ওদের দিকে।
“মোটেও আমি জেলাস নয়।”
“বললে হবে! জেলাস-জেলাস-জেলাস।”
“বেশ-বেশ-বেশ। খুশী?”
“না, খুশী নই। এবার প্লিজ একটু সিরিয়াস হও প্রত্যুসা। একটা
চাকরি-বাকরি জোটাও। এরপর বয়স পেরিয়ে গেলে..”
“চেষ্টা তো করছি!!”- প্রত্যুসা
কথাটা বলার সাথে সাথে দিপু বুঝতে পারলো ও’র মুড অফ হয়ে যাচ্ছে।
মুড চেঞ্জ করার জন্য সাথে সাথে ও
বলে উঠল, “এই জানো, আমার টিমে কাল একজন ব্রিটিশ মহিলা জয়েন করেছেন, উফ ও’নাকে যা দেখতে না!
ফাটাফাটি।”
“যাক নিশ্চিন্ত হলাম,” বলে প্রত্যুসা হাত তুলল।
“কেন?”
“তোমার অ্যাদ্দিনে একটা হিল্লে হল বলে!”
“হিল্লে! আমার?”
“হুম। এবার ওই ফাটাফাটির প্রেমে পড়িবে। তাহার
পর...”
“তাহার আগে তোমার পিঠে একটি কিল পড়িবে। সত্যি প্রত্যুসা, তুমি না কেমন
জানি একটা! কোনো পজেসিভনেস নেই। আমি যদি কোনোদিন চলেও যাই, তোমার কিস্যু এসে যাবে
না।”
“তাই? তবে তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, এই
জিনিষটা কিন্তু তোমাকে আর কেউ দেবে না,” বলে হ্যান্ডব্যাগের চেন খুলে
নিজের হাতে বানানো নাড়ুর কৌটোটা বের করে দিপুর হাতে দিল প্রত্যুসা। কৌটোর ঢাকনাটা একটুখানি খুলে আস্তে করে নাকের সামনে
নিয়ে এল দিপু। নাড়ুগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিজের মানুষের জন্য রক্ত জল করে তৈরী হবার গন্ধ। খুব নিচু
গলায় দিপু বলল, “আমার ভয় করে প্রত্যুসা।”
“ভয়? কিসের ভয়?”
“জানি না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকবে তো?”
“কেন থাকবে না? সব ঠিক থাকবে।”
“কি জানি! শুধু মনে হয়, এই বুঝি সব ভেঙ্গে গেল।
তছনছ হয়ে গেল। কেন এমন মনে হয় প্রত্যুসা?”
“এত ভাবনার কি আছে? চলতে দাও। চলতে চলতে যদি
ভাঙ্গে, তা হলে চলতে চলতেই আবার ঠিক গড়ে উঠবে। শুধু থেমে যেও না!!”
“আর হ্যাঁ মশাই,
নেক্সটবার পূজোর সময় যখন কলকাতায় আসবে, বাবার সঙ্গে আমাদের
ব্যাপারে কথা বলে বিয়ের বিষয়টা একটু এগিয়ে নিয়ে যেও.. প্রফেশনালি যে জায়গায় আজকে
পৌঁছেছো, আমি শিওর বাবা জানতে পারলেও তোমার ব্যাপারে খুব
গর্ববোধ করবে; ঠিক আমার মত!!”-কথাটা বলতে বলতেই একটা গর্বের হাসি নিয়ে
প্রত্যুসা দিপুর হাতটা জড়িয়ে ধরে।
****
এয়ারপোর্টের ইন্টারন্যাশানাল
অ্যারাইভ্যাল লাউঞ্জ দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে দিপু ভাবছিল ঠিক কিভাবে তরুণকাকুকে ওর
আর প্রত্যুসার বিয়ের ব্যাপারে অ্যাপ্রোচ করা যায়। কলকাতা
এয়ারপোর্টের প্রতিটা এন্ট্রান্সেই ২ টো করে ঢাকির বিশাল থারমোকলের পোস্টার আর
প্রতিটা অ্যাডবোর্ডে মিনিটে মিনিটে প্লে হওয়া প্রিয় গোপাল বিষয়ীর পুজো কালেকশনের
অ্যাড এইটা জানান দিচ্ছিল যে, আজ মহালয়া; দেবীপক্ষের শুরু। যে কোনো শুভ কাজের সূচনার জন্য একেবারে আদর্শ দিন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দিপুর মনে একটা টেনশনের চোরাস্রোত বইছিল। কলেজের ফোরথ ইয়ার কমপ্লিট করার পর যখন ও কাকু
কাকিমাদের বাড়ী ছেড়েছিল, তখন ওদের প্রেমের মাত্র ৬ মাস বয়স; ও নিজেই অতটা শিওর ছিল না ওর আর
গুগলির সম্পর্কটা টিকবে কিনা সেই ব্যাপারে। তারপরেও ওদের সঙ্গে ফোনে টুকটাক ফর্মাল কথাবার্তা হয়েছে ঠিকই; কিন্তু ওর আর প্রত্যুসার সম্পর্ক নিয়ে কখনওই ওদের সঙ্গে কথা বলেনি। এতদিন
ওদের পুরো প্রেম পর্বটাই চলেছে কাকু-কাকিমার চোখের আড়ালে। আজ হয়তো ও পেশাগত দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু তা-ও এতবড় একটা প্রস্তাব নিয়ে ওদের সামনে যাওয়া.. ভেবেই টেনশনে হাত পা
ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল দিপুর।
এয়ারপোর্ট থেকে
উত্তর পঞ্চান্নগ্রামের ডেস্টিনেশন পয়েন্ট দিয়ে অ্যাপ ক্যাবটাতে চেপে বসে দিপু। রুপালি কাকিমাকে ফোন করে যেনে নিয়েছে যে কাকু-কাকিমা দু’জনেই আজ বাড়ীতেই আছে। ফোনটা আবার রিং হচ্ছে; প্রত্যুসা ফোন করছে।
“হ্যালো!! শোনো
না, আমি এখন দিশারীদের বাড়ীতে চলে যাচ্ছি। আমি সামনে থাকলে তোমার আবার পারফরম্যান্স প্রেশার হতে পারে তো.. তাইজন্য। যা বলার, একেবারে কনফিডেন্টলি বলবে বাবাকে, ওকে? আর হয়ে গেলে একটা ফোন করে জানিও কি কথা হল। লাভ ইউ বেবি, ভেরি সুন উই উইল বি টুগেদার!!”- প্রতুসার কথাবার্তায় ঝরে পড়ে দিপুর প্রতি
আত্মবিশ্বাস।
“ওকে বাবু.. লাভ
ইউ টু!!”
রুপালিদের
বাড়ীতে পৌঁছে ড্রয়িংরুমের সোফাতে বসেই উল্টোদিকে বসে থাকা ও’র কাকু কাকিমা’কে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলে দিপু। কিভাবে আর কখন ওর আর গুগলির নিজেদের ওপর দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, কতদিন ধরে ওরা একসাথে রয়েছে; ও’রা যে সম্পর্কটাকে একধাপ উপরে নিয়ে গিয়ে বিয়ের ব্যাপারে ভাবছে, বলতে ভোলে না সেটাও।
প্রায় ২ মিনিটের
পিন ড্রপ সাইলেন্সের শেষে প্রথম মুখ খোলে রুপালিই, “এত বড় একটা ব্যাপার তোরা এতদিন ধরে আমাদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলি? গুগলি তো না হয় ছোটো, কিন্তু তোকেও তো আমি নিজের ছেলের মত ভেবেছিলাম, বিশ্বাস করে এই বাড়ীতে থাকতে দিয়েছিলাম.. আজ তার এই মর্যাদা দিলি??”- কথাটা শেষ হতেই দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ে রুপালির গলায়।
“বুঝতে পারছি কাকিমা
তোমাদের এরকম মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক; কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগে এই বিষয়ে কিছু জানতে পারলে তো তোমরা আরওই খারাপভাবে
নিতে ব্যাপারটা!!”
“তো এখন কি খুব ভালোভাবে
নিয়েছি বলে মনেহচ্ছে তোর? আর এই ভালোবাসাটা কি জিনিষ ভাই? ওসব আমায় শেখাতে আসিস না! শেষ ৩ বছর ধরে তোরা এই সব ঢঙ
করা শুরু করেছিস তো; মনে রাখিস, তার আগে ২২ টা বসন্ত ধরে আমিই আমার মেয়েকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি.. আমার মনে
ও’র বিয়ে দেওয়া নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে.. আর তুই সেই স্বপ্নটা পূরণ করার পথে বাধা হয়ে
দাঁড়াচ্ছিস!!”- তরুণের চীৎকারে রুপালি আর দিপু ২ জনেই খানিকটা ভয় পেয়ে যায়।
“আরে তুমি প্রথমে
মাথা ঠাণ্ডা করো!! এমনিতেই তোর কাকুর হাই বি পি র প্রব্লেম.. তার মধ্যে তুই এমন একটা
কথা কিছু না ভেবে বলে দিলি। আমি ধরেই নিচ্ছি গুগলি তোকে প্রথম ওই কথা গুলো বলেছিল, কিতু তুই তো বড় দাদা হিসেবে ওকে বোঝাতে পারতিস যে ও যেটা করতে যাচ্ছে সেটা ঠিক
নয়। এখন তো আমার মনে হচ্ছে দুধ দিয়ে কালসাপ
পুষেছিলাম!!”- বলতে বলতে কেঁদে ওঠে রুপালি।
“ঠিক আছে তোমরা শান্ত
হও!! তোমাদেরকে তো এখনই হ্যাঁ বা না বলতে হচ্ছে না, আর আমি এটাও বলছি না যে খুব শিগগিরিই আমাদের বিয়ে দিয়ে দাও। তোমরা একটু সময় নিয়ে ভেবে দেখো.. আমি কথা দিচ্ছি, আমি বিয়ের পর প্রত্যুসাকে খুব ভালো রাখবো!!”- দিপু শান্ত
ভাবে ওদের ২ জনকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে।
কিন্তু তার ফল হয়
হিতে বিপরীত। তরুণ রাগে আরও অন্ধ হয়ে গিয়ে কিছু স্পর্শকাতর
কথা বলে ফেলে- “আরে তোর কাকা আমাদের বাড়ীতে কাজ করতে আসতো। আজকে যদি আমাদের এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলির কেউ এটা শোনে যে
কাজের লোকের বাড়িতে আমি মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, একবার ভেবে দেখেছিস আমাদের মানসম্মানটা কোথায় যাবে?? ৪ বছর আমার বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করেছিস, একটা নয়া পয়সা দিতে হয়নি!! পুরো দুনিয়া, এমন কি তোদের গ্রামের লোকেরাও তোদের পিছনে তোর মায়ের আর তোর সুবলকাকার সম্পর্ক
নিয়ে ছিছিক্কার করে.. কই, তোকে বাড়ীতে থাকতে দেবার সময় তো এইসব একবারও ভাবিনি..
শুধু তোর কাকার কিছু ঋণ ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলাম; তার এই প্রতিদান দিলি তুই??”
এতক্ষণ ধরে দিপু
ওদের সব কথা খুব শান্তভাবে শুনছিল; কিন্তু মায়ের ব্যাপারে তরুণের মুখ থেকে ওই কথাগুলো শোনার পর ওরও চোয়াল শক্ত হয়ে
যায়!! ওর মনে হতে থাকে যে; হ্যাঁ, ও প্রত্যুসাকে মন থেকে ভালোবেসেছে; কিন্তু সেটা কোনোমতেই ওর মায়ের সম্মানের থেকে বড় নয়। তাও মাথাটা ঠাণ্ডা রেখে কাকু কাকিমা’র উদ্দেশ্যে বলে- “আচ্ছা তাহলে তোমরা ঠিক কি চাইছো?”
“যদি মনে হয় আমাদের
থেকে কোনো উপকার পেয়েছিস; আর সত্যিই আমাদের ভালো দেখতে চাস, তাহলে এখুনি দূরে চলে যা!! এই বাড়ী থেকেও, আর গুগলির জীবন থেকেও!! ও তো আমাদের মেয়ে, ওর কি’সে ভালো হবে সেটা আমরা বুঝে নিতে পারবো”-
ভাবলেশহীন মুখ করে বলে ওঠে রুপালি।
সঙ্গে সঙ্গে তরুণ
হিস হিস করে ওঠে, “আর তা না করলে কিন্তু আমার কিছু হয়ে গেলে দায় তোর ওপর
বর্তাবে!!”
সেদিন বাড়ী ছেড়ে
বেরনোর সময় দিপু ওদের ২ জনকে একটা খুব দামি কথা বলে যায়, “ঠিক আছে; তোমাদের ঋণের কথা মাথায় রেখে মনে কষ্ট হলেও আমি সর্বতোভাবে
প্রত্যুসার জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবো, আর কখনো ওর ব্যাপারে জানতেও আসবো না। কিন্তু তোমরা কি এত সহজে আমাকে ওর মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে?”
****
একমাসের ছুটি নিয়ে
দেশে ফিরেছিল দিপু। কত প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে এসেছিল। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। ৩ দিনের মাথাতেই ঠিক করে নিল- কাজে ফিরতে হবে। এই শহরে, পুজোর আবেগের মধ্যে থাকলে ওর জীবনটা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। যা ভাবা তাই কাজ। কোম্পানির এইচ আর কে ফোন করে ফেরার টিকিটটা
প্রি-পোন করিয়ে নিয়ে পুজোর মাঝখানেই কলকাতা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিল। প্রথম ক’দিন ফোন আর সোশাল মিডিয়ায় প্রত্যুসার
ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার সমস্ত চেষ্টাগুলোকে ইগনোর করার পর; শেষে ফোন নাম্বার থেকে শুরু করে স্কাইপ আই ডি পর্যন্ত সব কিছু বদলে ফেলল। সোশাল মিডিয়াতেও সমস্ত চ্যানেলগুলোতে প্রত্যুসাকে ব্লক
করে দিল।
কিন্তু এইভাবে একা
একা কতদিনই বা আর থাকতে পারতো!! একমাসের মধ্যে এইভাবে নিজেকে একঘরে করে ফেলার চেষ্টাটা
ওর কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে থাকলো। খুব ইচ্ছা করছিল মায়ের কাছে ফিরে যাবার.. বা প্রত্যুসাকে একবার অন্তত চোখের দেখা
দেখার!! কিন্তু মায়ের ব্যাপারে তরুণকাকুর বলা ওই কথাগুলো মনে পড়তেই আবার ওর চোয়াল শক্ত
হয়ে উঠল, কলকাতা শহরটার উপরেই ওর ঘৃণা জন্মে গেল। দশদিনের মাথায় কোম্পানিকে রিকোয়েস্ট করে মায়ের জন্য ডিপেন্ডেন্ট
ভিসার প্রসেসিং শুরু করল, তিন মাসের মধ্যে মা’কে সঙ্গে নিয়েই বিদেশে থাকতে শুরু করল।
মায়ের সাথে ব্যাপারগুলো
শেয়ার করার পর থেকে একটা সময়ের পর ও আস্তে আস্তে মন থেকে হালকা হতে থাকল। মায়ের বোঝানোতেই হয়তো একটা সময়ের পর তরুণকাকু আর রুপালি
কাকিমার উপরে ওর রাগটা অনেকটা প্রশমিত হয়ে গেল, সাথে কলকাতা শহরের প্রতি ওর ঘৃণাটাও!!
গুগলি প্রথমে কয়েকদিন
সবরকমভাবে দিপুর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলো। ব্যর্থ হবার পর ও ও বেশ মনমরা হয়ে গেল। মা বাবা ও’কে সেদিনের কথাবার্তার ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু না জানালেও তরুণ ও’কে একটা কথাই বলেছিল, “বিশ্বাস কর মা; শুধু চেক করে দেখতে চেয়েছিলাম যে ও সত্যি তোকেই ভালোবাসে নাকি সমাজে আমাদের স্ট্যাটাসটাকে! যে মুহূর্তে আমি ও’কে বললাম যে তুই আমার মেয়েকে বিয়ে করতেই
পারিস; কিন্তু একটা কথা যেনে রাখ- আমি আমার সম্পত্তির একটা কানাকড়িও
ওর নামে লিখে দিইনি, পুরোটাই অনাথ আশ্রমের নামে দান করা আছে..!! কথাটা শোনার
সঙ্গে সঙ্গে নিজেই পত্রপাঠ বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে ও বিদায় হয়েছিল।”
“শোনো বাবা, তুমি আমাকে যাই বোঝানোর চেষ্টা করো না কেন, আমি এগুলো কোনোমতেই বিশ্বাস করি না। আমি ও’র সঙ্গে ৩ বছর ছিলাম! নিজে পেশাগত ভাবে
এতটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও যে ছেলে নিজে থেকে আমাকে সরকারী চাকরির ফর্ম ফিলাপ করিয়ে
স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য কন্সট্যান্টলি ইন্সপায়ার করত, তার আর যাই হোক তোমার সম্পত্তির উপরে কোনো লোভ থাকবে না!!”- একটা সময় পর্যন্ত গুগলি
খুব জোর দিয়ে বাবার কথাগুলোকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করত।
কিন্তু যত দিন যেতে
থাকল, ওর জীবনে দিপুর অনুপস্থিতির জন্য দিন দিন ওর প্রতিবাদগুলোও
ফিকে হতে থাকল। তরুণের প্রায় দু’বছরের চেষ্টায়; একটার পর একটা সম্বন্ধ নাকচ হতে থাকার পর, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির চাপে পড়ে, বাবার মন রাখতে একরকম বাধ্য হয়েই একজনকে পছন্দ করলো প্রত্যুসা।
দিপুর সাথে হঠাথ
করে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবার ঠিক আড়াই বছর পর, খুব ধুমধাম করে হাইকোর্টের রিটায়ার্ড জাজের ছেলের সঙ্গে প্রত্যুসার বিয়ে হয়ে গেল। তরুণ ঠিক যেভাবে স্বপ্ন দেখেছিল, সেরকম রাজকীয় ভাবেই মেয়ের বিয়ে দিলো। কিন্তু বিয়ের সবকিছু খুব ভালোভাবে ম্যানেজ হয়ে গেলেও পণের
ব্যাপারে পাত্রপক্ষের সঙ্গে যা কথা হয়েছিল, বিয়ের সময়ে তার থেকে ও আড়াই লাখ টাকা কম জোগাড় করতে পেরেছিল।
এত বড় বাড়ীতে মেয়ের
বিয়ে হয়েছে.. আট লাখ টাকা তো ওদের কাছে হাতের ময়লা। ওদের বাড়ীতে থাকলে মেয়ে রানীর মত থাকবে; সেরকম কোনো কাজ করতে হবে না; পায়ের উপর পা তুলে আরাম করতে পারবে.. মনে মনে এগুলো ভেবে নেওয়ার পরই তরুণ এই বিয়ের
প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলো; সে যতই পাত্রপক্ষ পাকা দেখার সময় পণ দাবি করুক! বিয়ের সময় যে টাকাটা বাকি রয়ে গেছিলো, সেটা দিয়ে দেবার জন্য ও ২ মাস সময় চেয়ে নিয়েছিল ওদের থেকে!!
যদিও বাস্তবে ২ মাসের
মধ্যে পুরো টাকাটা জোগাড় করে উঠতে পারেনি তরুণ; আসলে মেয়ের বিয়েতে আনুষঙ্গিক খরচাপাতিও তো প্রচুর.. সব মিলিয়ে হয়ে ওঠেনি! মেয়ের বিয়ে দেবার ঠিক ৬২ দিনের মাথায় তরুণ আর রুপালির
জীবনে আকাশ ভেঙে পড়েছিল। গুগলির শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা ফোন এসেছিল ওদের কাছে- “রান্নাঘরে গ্যাস বারস্ট করাতে
আপনার মেয়ের শরীর বেশ খানিকটা পুড়ে গেছে, আপনারা পারলে ঢাকুরিয়া আমরির এমারজেন্সি ওয়ার্ডে চলে আসুন।”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে
হাসপাতালে পৌঁছে ফুটফুটে মেয়েটার ওই অবস্থা দেখে ২ জনেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। হাসপাতালেই তরুণের পরিচিত একজন ডাক্তার গুগলির কেস হিস্ট্রিটা
চেক করে প্রথমবার ওদের জানিয়েছিল যে, আগে থেকে গ্যাস পাইপ কেটে আনলক না করা থাকলে এত ভয়ঙ্কর ভাবে বারস্টে কারো শরীরের
৮০% পুড়ে যাওয়া অসম্ভব; সুতরাং পুরো ব্যাপারটাই প্রি-প্ল্যানড!!
এরপর ভয়ঙ্কর আর্থিক
কষ্টের মধ্যেও হাসপাতালে যাতায়াত করার ফাঁকেই তরুণ গুগলির শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে গার্হস্থ
হিংসার কেস ঠুকবে ভেবেছিল; কিন্তু হাইকোর্টের প্রাক্তন জাজের ফ্যামিলির বিরুদ্ধে
মামলা লড়ার জন্য কোনো উকিলকেই রাজি করাতে পারেনি ও!!
****
আজকের রাতটাও গুগলিকে
ভেন্টিলেশনে রাখবে.. আজকে নিয়ে টানা ৮ দিন। সুতরাং বাড়ীর কাউকে আজ রাতেও হাসপাতালে
থাকতে হবে; যদি হঠাথ কোনো এমারজেন্সি দরকার পড়ে..
“বুঝলি তো, তোর কাকু বাজার থেকে একজন বন্ধুর বাড়ীতে চলে গেছে; অনেকদিন পর হঠাথ বাজারে দেখা হয়েছে বলে খানিকটা জোর করেই
ও’কে বাড়ীতে নিয়ে গেছে!! ও’র ফিরতে দেরি হবে”-তরুণের থেকে হাসপাতালের ব্যাপারটা শোনার পরই দিপুর থেকে কোনওরকমে
মিথ্যেটা লোকানোর জন্য বলে ওঠে রুপালি।
এত কিছু হয়ে যাবার
পরও ছেলেটা যখন ওদের ব্যাপারে এত কিছু মনে রেখেছে, তাহলে নিশ্চয়ই একবার হলেও দিপু প্রত্যুসার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে.. রুপালি মনে
মনে ভাবে। কিন্তু ও’কে অবাক করে দিয়ে দিপু প্রত্যুসার জীবন
থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার অবস্থানে অটল থেকে ওর ব্যাপারে একটা কথাও উচ্চারণ না করে
বলে ওঠে-“ঠিক আছে কাকিমা!! আসছি তাহলে..!! আবার পরে দেখা হবে।”
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই
সন্ধে নামবে। আবহাওয়াটাও বেশ গুমোট। দিপু গাড়ীটা স্টার্ট দিয়ে ইউ টার্ন করিয়ে একরাশ ধুলো উড়িয়ে
রুপালিদের বাড়ীর গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় অন্যান্য গাড়ীর ভিড়ে মিশে যায়! হঠাথ ঝমঝমিয়ে
বৃষ্টি নামে.. গাড়ীর ধুলো মিশে যায় মাটিতে!!!!
----সমাপ্ত----
2 comments:
Khub valo laglo
Khub valo laglo
Post a Comment