****
“শুভ বিজয়া শত-দা !!”- অনেকক্ষণ ধরে হ্যান্ডশেক করার পর গিফট প্যাকটা ব্যাগ থেকে বার করে শতদীপের দিকে এগিয়ে দেয় রুপালি; “ধর; মা পাঠিয়েছে!!”
রুপালির হাত থেকে নিজের হাতটা কোনোমতে ছাড়িয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শতদীপ বলে ওঠে-“সে কি!! আবার কাকিমার এইসব পাঠানোর কি দরকার ছিলো? আরে পূজোর পর স্টুডেন্টরা প্রথমবার কোচিং সেন্টারে এলে; তাদের স্যারের তরফ থেকে ট্রিট পাওয়া উচিৎ; এটাই রেওয়াজ!! লাস্ট ৩ বছর ধরে দেখছি কাকিমা একটা আলাদাই ব্যাপার শুরু করেছে। দেখি কাকিমাকে জিনিষটা বোঝাতে হবে। আসলে আজকাল তো কাকু-কাকিমা ২ জনের সাথেই ফোনেও এতটাই কম কথা হয় যে, যখন কথা বলি এইসব ব্যাপার আলোচনা করার কথা মাথাতেই থাকে না......ওই কি চলছে; কেমন আছো, তারপর তোর রেজাল্ট নিয়ে আলোচনা......!!”
“কেউ ভালোবেসে কোনো কিছু দিলে এত ভাবনাচিন্তা করতে নেই!! তাছাড়া তুমি কি আমাদেরকে আজ থেকে চেনো নাকি? মনে আছে তো; সেই ক্লাস সেভেনে যখন প্রথম ভূগোলে ফেল করেছিলাম, আমাকে পড়াতে বাড়ীতে আসা শুরু করলে। যখন থেকে বাবার মোটামুটি কনফিডেন্স চলে এল যে এবার গ্রুপের মধ্যে পড়লেও আমি ভূগোলে আর ফেল করব না, তখন থেকে তুমি আমার প্রাইভেট টিউটর হওয়া ছাড়লে আর আমি এই শ্যামনগরের ওয়ার্ল্ড ফেমাস ‘শত-দা’র কোচিং সেন্টার’ এর মেম্বার হয়ে গেলাম; তাও প্রায় ৫ বছর হতে চলল। যতদিন ধরে তোমার কাছে পড়ছি; আর কখনো ভূগোলে ফেল করিনি; আজকে প্রায় এম. এস. সি. কমপ্লিট হতে চলল.... কিছু তো ক্রেডিট তোমার আছেই.. তো ধরে নাও তার জন্যই মা পাঠায় প্রতিবার; নাও এবার রাখো!!”- একটানা কথাগুলো বলে থামল রুপালি।
“মেয়েটা আজকাল প্রচুর কথা বলতে শিখেছে!!”- কথাটা বলার সাথে সাথেই শতদীপ আলতো করে একটা আদুরে গাঁট্টা মারে রুপালির মাথায়-“আর এছাড়া তোর কি ডাউট ছিল যেন; যারজন্য বললি যে সবাই গেলে তারপর বলছি....??”
“বা বাঃ!! সবাই চলে যাবার পর ডাউট ক্লিয়ার করার ট্রিকটা তো তোমার জন্মদিন, কাকিমার জন্মদিন, বিজয়া, পয়লা বৈশাখ; এই প্রতিটা অকেশনেই আমি খেলে থাকি; আজ অবধি কোনোদিনও পড়া নিয়ে ডাউট জিজ্ঞেস করতে দেখেছো কি যে আজকে এক্সপেক্ট করছো? চলো আসছি..!!”- কথাটা বলতে বলতেই রুপালি কোচিং সেন্টারের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে সাইকেলের লক খোলা শুরু করে।
প্রতি শুক্রবার রুপালিদের ব্যাচটাই শতদীপের লাস্ট ব্যাচ থাকে সন্ধ্যাবেলার; পড়ানোর ঘরের লাইট বন্ধ করে শতদীপ উপরতলায় যাওয়া শুরু করে; সিঁড়ির কাছে পৌঁছে প্রতি শুক্রবারের মত রুপালিকে একই কথা বলে বিদায় জানায়; “সাবধানে যাস..পাকা বুড়ি একটা!!”
কোচিং সেন্টারের মোড়টা পেরোতেই রুপালির জন্য অপেক্ষা করছিলো পম্পা। রুপালি আসতেই সাইকেলের স্ট্যান্ড তুলে নিয়ে ওর সাথেই চলা শুরু করে; “সত্যি বাবা!! ধৈর্য আছে তোর বটে!! সেই এইচ. এস. শেষ হবার পর থেকে ট্রাই মেরে যাচ্ছিস। অন্য কোনো ছেলে হলে না.. এত দিনে লাট্টুর মত তোর পিছনে ঘুরতো। তোর কি মনে হয় প্রতিটা স্পেশাল অকেশনের গিফটগুলো যে আসলে কাকিমা দেয় না, তুই সাজিয়ে দিস; সেটা শত’দা বোঝে না.. আলবাত বোঝে!! কে জানে তারপরও কিভাবে এত স্বাভাবিক থাকতে পারে....!!”
শতদীপের দিক থেকে প্রকাশ্যে কোনো রেসপন্স না পেলেও এতগুলো বছর ধরে কেন যে ওর প্রতিই এতটা আকৃষ্ট লাগে নিজেকে, সেটা নিজেও জানে না রুপালি। ওর মনে পড়ে যায় প্রায় সাড়ে ৯ বছর আগেকার সন্ধ্যাবেলার সেই ঘটনাটা; যেদিন কিনা শতদীপ ওকে বাড়ীতে এসে পড়ানো শুরু করার পর প্রথম পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছিলো। ওই হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষাতে, রুপালি প্রথমবার ভূগোলে পাশ হয়তো করে গেছিলো; কিন্তু পেয়েছিলো মাত্র সাড়ে চৌত্রিশ।
তখন সদ্য এম. এস. সি. পাশ করা শতদীপের ভূগোলের প্রাইভেট টিউটর হিসেবে শ্যামনগরে বেশ ভালোই জাঁকিয়ে নামডাক হয়েছে। তার ওপর রোড অ্যাক্সিডেন্টে বাবার মারা যাওয়া আর মায়ের প্যারালাইজড হয়ে যাবার পরও; অত ছোটো বয়সে প্রাইভেট টিউশানি করে নিজের দমে এম. এস. সি. কমপ্লিট করার জন্য যারা হয়তো ঠিক করে চিনতোও না, তারাও শতদীপকে খুব সম্মান করতো। এমনই একজন সাইকেল সারানোর দোকানের মালিকের থেকে শতদীপের ব্যাপারে জানতে পেরে অমলবাবু; মানে রুপালির বাবা শতদীপকে ও’র মেয়ের প্রাইভেট টিউটর হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করেন।
তো রুপালির হাফ-ইয়ারলির রেজাল্ট শোনার পর; অমলবাবু এত রেগে গেছিলেন যে শতদীপের সামনেই মেয়েকে চূড়ান্ত বকা শুরু করেন- “তোর লজ্জা বলে কিছু আছে!! শ্যামনগরের বেস্ট টিউটর; যার কাছে পড়ে লোকে বি. এস. সি. তেও ফার্স্ট ক্লাস পাচ্ছে, তার কাছে পড়েও তোর এই রেজাল্ট!! তোর জন্য আর কি করতে হবে আমাকে যাতে কিনা তুই ভালো রেজাল্ট করবি; ভগবানই জানেন....!!”সেই প্রথম ওর কোনো টিচারকে প্রথমবার ওর হয়ে স্ট্যান্ড নিতে দেখেছিলো রুপালি। এর আগে স্কুলের প্যারেন্ট-টিচার মিটিং-এই হোক কিংবা প্রাইভেট টিউটরদের সাথে ওর রেজাল্ট নিয়ে বাবার আলোচনার সময়েই হোক; ও ভালো রেজাল্ট করলে সেটা টিচারের ক্রেডিট; আর ও খারাপ রেজাল্ট করলে সেটা ওর সমস্যা; বরাবর এই ট্রেন্ডই দেখে এসছিলো রুপালি। প্রথমবার ও এর থেকে আলাদা কিছু দেখেছিলো শতদীপের থেকে; তাও সেই সময় যখন কিনা ও কোনোমতে পাশ করেছিলো শতদীপের কোচিং-এ।
“দেখুন কাকু, সমস্যা তো কিছু একটা আছেই; তবে সেটা রুপালির দিক থেকে যতটা; আমার মনে হয়, আমার দিক থেকে বেশী। প্রথমত, জাস্ট ৬ মাস হয়েছে ও আমার কাছে পড়ছে; এত তাড়াতাড়ি খারাপ রেজাল্টের জন্য শুধু ওকে দায়ী করাটা জাস্টিফাইয়েডও নয়! আরও একটু সময় দিন, আমাদের ২ জনকে একসঙ্গে বসেই ২ জনের সমস্যাগুলো বুঝতে হবে। আশা করছি এরপর আস্তে আস্তে ইম্প্রুভমেন্টই হবে”- শতদীপের কথাগুলোতে শুধু অমলবাবুই নন; ভরসা পেয়েছিলো রুপালিও।
সেই সময় থেকেই শতদীপের এই আগলে রাখা মনোভাবের প্রতি খানিকটা হলেও দুর্বলতা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো ওর। শুধু সময় নিয়ে নোটস তৈরি করাই নয়; ম্যাপ পয়েন্টিং-এর শর্টকাট বোঝানো, বিভিন্ন জায়গার ভৌগোলিক বিশেষত্ব মনে রাখার জন্য নানারকম মজার উপায় বাতলে দেওয়া; রুপালি পড়াশোনার ব্যাপারে যে কোনো হেল্প চাইলেই শতদীপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এই ধরণের কোনো না কোনো সলিউশন দিয়ে দিত। যত দিন যেতে থাকলো, রুপালি বুঝতে শুরু করলো, পড়াশোনার বাইরেও বেশ কিছু ব্যাপারে শত’দার সাথে ওর মত বেশ মেলে। আস্তে আস্তে; বাবা-মা’র অ্যানিভারসারি গিফট কেনা থেকে শুরু করে ওর নিজের পূজোর টপ কেনা পর্যন্ত সব ব্যাপারেই শত’দার মতামত নেওয়া শুরু করল ও।
শতদীপও খুশী মনে রুপালির সব আবদার মেনে নিত। রুপালিই ও’র একমাত্র এমন স্টুডেন্ট ছিল, যাকে ও একেবারে গ্রাউন্ড লেভেল থেকে ওপরে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিলো। মাধ্যমিকে রুপালি যখন ভূগোলে ৯৭ পেয়েছিলো, তখন অমলবাবু আর রুপালির থেকেও বেশী খুশী হয়েছিলো ও; গর্বে বুক ফুলে উঠেছিলো ওর। শতদীপের বিশ্বাস ছিল; ওর নিজের না ছুঁতে পারা স্বপ্নগুলোকেও একমাত্র রুপালিই অ্যাচিভ করার ক্ষমতা রাখে। সেই কারণে ব্যাচ নিয়ে পূজো পরিক্রমাতে বেরোনোই হোক, বা অ্যানুয়াল পিকনিকে; সবসময় রুপালিকে একটু বেশীই আগলে রাখতো ও। এমনকি রুপালি কোচিং সেন্টারে পড়া শুরু করার পর; রাতে ব্যাচ শেষ হতে একটু দেরী হয়ে গেলে, আর পম্পা বা অন্য কেউ ওর সাথে না যাওয়ার থাকলে, রুপালির পিছু পিছু সাইকেল নিয়ে ওর বাড়ীর গলি পর্যন্ত ওকে ছেড়ে আসতো শতদীপ।
“এবার এম. এস. সি. ফাইনাল এগসামের আগে লাস্ট যেদিন পড়া থাকবে, সেদিন ব্যাচ শেষ হবার পর ডাউট ক্লিয়ারিং সেশন ডিমান্ড করে ডাইরেক্টলি মনের কথাটা পেড়ে ফেল.. তোকে যেমন ভাবে সব ব্যাপারে আগলে রাখে, আই অ্যাম শিওর শত’দার দিক থেকে উত্তরটা না হলেও তোকে অ্যাটলিস্ট খেয়ে ফেলবে না!! আর তোর মনেও একটা শান্তি ফিরে আসবে; সবচেয়ে বড় কথা কোনো রিগ্রেট থাকবে না.. শান্তি মনে অন্য কোনো হ্যান্ডু ছেলেকে লাইন মারতে পারবি..!!”- হঠাথ পম্পার কথাগুলো শুনে রুপালি ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে।
“ধুর পাগলি!! কি যে বলিস না..!! বাই দা ওয়ে, হঠাথ সাইকেল থেকে নেমে গেলি কেন?”- ঘোর কাটিয়ে উঠে কোনোক্রমে প্রশ্নটা পম্পার দিকে ছুঁড়ে দেয় রুপালি।
“এই তো সমস্যা!! শত’দাকে নিয়ে ভাবতে থাকলে তুই যে কোন খেয়ালে চলে যাস, কে জানে। আনমনে সাইকেল চালাতে চালাতে বুঝতেও পারিস নি; তোর বাড়ী চলে এসেছে বাবু.. ঘোর থেকে বেরো!! ভাবলাম বাই বলার আগে আমার বন্ধুটাকে ২ টো জ্ঞান দিয়ে যাই; তাই ওই কথাগুলো বললাম।”
“ওহ তাই বল! হ্যাঁ সত্যি তো; খেয়ালই করিনি বাড়ী পৌঁছে গেছি। চল বাই; গুড নাইট!!”
“গুড নাইট!! যে কথাগুলো বললাম পারলে ভেবে দেখিস....!!”- পম্পা বিদায় নেয়।
রাতে খেয়ে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বিছানায় শুয়ে রুপালি পম্পার কথাগুলো ভাবতে থাকে; মেয়েটা কথাগুলো কিন্তু মন্দ বলেনি। কিন্তু শত’দা ওকে না করবে না; আর না করলেও ও সারাজীবন শত’দাকেই ভালবাসবে.. কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যেন রুপালি ঘুমিয়ে পড়ে।
****
“কি রে?? এই গিফটপ্যাকটাও নিশ্চয়ই রুপালিই দিয়েছে? আমার মনেই হচ্ছিল বিজয়ার পর তো ও খালিহাতে পড়তে আসবে না....!! বিশেষত শেষ ২-৩ বছর ধরে যা দেখছি আর কি!!”- শতদীপ রুপালি’র দেওয়া গিফটপ্যাকটা নিয়ে উপরে উঠে আসতেই রীনাদেবী; মানে শতদীপের মা বিছানায় শুয়ে বলে ওঠেন।
“তোমার টয়লেট পেয়েছে? দাঁড়াও ক্যাথিটারটা চেঞ্জ করে দি। আজকে ৩ টে ব্যাচ এতটা গায়ে গায়ে ছিলো যে মাঝখানে উপরে আসার সময়ই পাইনি। আর পড়ানো শেষ হতেই কারো না কারো কিছু না কিছু ডাউট.. তো ওইজন্য হয়ে ওঠেনি”- মায়ের ক্যাথিটার ব্যাগটা বদলানোর সময় বলে ওঠে শতদীপ।
“সে সব বুঝলাম না হয় বুঝলাম!! কিন্তু মেয়েটার দেওয়া গিফটগুলোকে যে এইভাবে প্রতি বছর যত্ন করে আলমারিতে সাজিয়ে রাখিস; খুলেও দেখিস না.. এর মানেটা কি? কখনো খুলে দেখলে হয়তো বুঝতে পারতিস মেয়েটা তোকে ঠিক কতটা ভালোবাসে..!!”
“আরে এইগুলো তো কাকিমার দেওয়া.. রুপালি পড়তে আসলে শুধু কাকিমা ওর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেয়!!”- কথাটা বলে শতদীপ ওর মা’কে বোঝানোর চেষ্টা করে যে ও আদৌ বোঝেই না যে রুপালি এই গিফটগুলো নিজের হাতে তৈরি করে পাঠায়।
“মিথ্যে কথাটা কাকে বলছিস; আমাকে নাকি নিজেকে? আমি উপরের ঘরে শুয়ে থেকে বুঝতে পারি যে এইগুলো ওই মেয়েটারই কাজ; আর ও তোর সামনে দাঁড়িয়ে তোর হাতে এগুলো তুলে দেয় আর তুই বুঝিস না এটা বললেই হবে? আজ প্রায় বছর দশেক হতে চলল আমি শয্যাশায়ী; ছেলের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছি না!! ভগবানের আশীর্বাদে একটা এত সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে নিজে থেকে তোর কাছে আসতে চাইছে; আর তুই.... নিজের ফিলিং গুলোকে আর ওর দেওয়া গিফটগুলোকে আলমারিতে ভরে রেখে দিচ্ছিস!! আরে কখনো কখনো তো আমারও ইচ্ছা হয় এটা দেখতে যে আমার ছেলেরও একটা ফ্যামিলি হোক; ৩ জনে একসাথে হাসিখুশী থাকি; বাড়ীর কাজে সে তোকে কিছু ভাবে হেল্প করুক!! রান্নাবান্না না হয় ছেড়ে দিলাম; অ্যাটলিস্ট আমায় ওষুধ খাওয়ানো, কখনো তুই কাছে না থাকলে ক্যাথিটার চেঞ্জ করে দেওয়া..এইসব কাজগুলো তো অন্তত নিজের ভেবে করবে!!!!”- একটানা কথাগুলো বলে চলেন রীনাদেবী।
“ব্যাপারটা তা নয় মা! আসলে এত ছোটো থেকে ওকে পড়াচ্ছি, কাকু-কাকিমা সব সময় আমাকে ওর গার্জিয়ান হিসেবেই ট্রিট করে এসছে; হয়তো সেইজন্যই পূজোয় ঘুরতে বেরনোর সময়ই হোক কিংবা ওদের ব্যাচের অ্যানুয়াল এক্সকারশনে, আমার সঙ্গে যাচ্ছে শুনলেই ওকে এককথায় ছেড়ে দেয়। যদি ওরা এখন আমাদের ২ জনের ব্যাপারে এইসব জানতে পারে, কে জানে ওরা কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে!! তাছাড়া কবে থেকে তোমাকে বলছি যে; তোমাকে দেখার জন্য বাড়ীতে একজন আয়া মাসি রাখি; তোমায় স্নান করানো বা ওষুধ খাওয়াতে কিছুটা হেল্প হবে; আর তোমারও সবসময় নিজেকে এরকম একা একা লাগবে না....তুমি তো আমার কথায় পাত্তাই দাও না..!!”- শতদীপ কথাগুলো বলার পর ও আর ওর মা ২ জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
নীরবতা ভাঙে শতদীপই- “আমার রুপালিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে মা, ও একদম শূন্য থেকে শুরু করে আজকে অলমোস্ট এম. এস. সি. কমপ্লিট করার মত জায়গায় এসে পৌঁছেছে; আমি চাই, আমার না ছুঁতে পারা স্বপ্নগুলো ও আমার হয়ে অ্যাচিভ করুক..!! এটাই আমার ভালোবাসার ধরণ, আমি ওকে এভাবেই ভালোবাসি!!”- রুপালির আজকে দেওয়া গিফটপ্যাকটা আলমারিতে পুরনো গিফটপ্যাকগুলোর উপরে রাখার সময় বলে ওঠে শতদীপ। কথাগুলো বলার সময় ছেলের যে চোখ ছলছল করছে, সেটা বেশ বুঝতে পারেন রীনাদেবী।
“দেখ বাবু তুই খারাপ মনে করিস না! কিন্তু সবার জীবনেই একজন সুখ-দুঃখের সঙ্গী থাকাটা না খুব জরুরী। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে আমি সবসময় তোর বাবাকে কাছে পেয়েছি; আজকে জীবনের প্রায় শেষ লগ্নে এসেও সারাদিন বিছানায় শুয়ে থেকে নিজেকে বড্ড একা একা লাগে! আর তোর জীবন তো এখন সবে মধ্যগগনে.. একবারও ভেবে দেখেছিস কাল’কে আমি না থাকলে পড়ানোর বাইরে বাকি সময়টা তোর কিভাবে কাটবে..?? শেষ ১০ বছর আমাকে এটা শিখিয়েছে যে একা থাকা বড্ড কঠিন; আর আমি চাই না আমি চলে যাবার পর আমার ছেলে একাকীত্বে শেষ হয়ে যাক.. সেইজন্যই আমার পয়সা দিয়ে বাড়ীতে আয়া রাখার চেয়ে ছেলের বউমা’কে বাড়ী নিয়ে আসার আগ্রহ বেশী!! প্লিজ বাবু, কখনো শুধু আমায় নিয়ে চিন্তা করা পেরিয়ে নিজের জন্যও চিন্তা কর..!!!!”- কথাগুলো বলার পর আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন রীনাদেবী।
****
আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারী; শুক্রবার। রুপালিদের এম. এস. সি. ফাইনাল পরীক্ষার আগে কোচিং-এ পড়তে আসার শেষ দিন। বরাবরের মত রুপালি আর পম্পা একসাথেই কোচিং-এ এসেছে। আজকে শতদীপ কি যে পড়াচ্ছে, তাতে রুপালির আদৌ কোনো মনই নেই। ও শুধু পম্পা যে উপদেশটা দিয়েছিলো ক’মাস আগে, সেটা নিয়েই ভেবে চলেছে। শুধু আজকে নয়, প্রায় শেষ ১ সপ্তাহ ধরে। এমন কি আজকে পড়তে আসার সময়ও পম্পা ওকে প্রপোজ করার ব্যাপারে “অল দা বেস্ট” বলেছে। এইসব ভাবতে ভাবতে রুপালি হঠাথ পম্পার দিকে তাকায়; পম্পা আজকে ওর থেকে একটু দূরে বসেছে। চোখাচোখি হতেই পম্পা ওকে আঙুলের ইশারায় ফের অল দা বেস্ট সাইন দেখায়। “আমি যা ভাবছি এই মেয়েটাও ঠিক সেইটাই কি করে ভাবছে??”- রুপালি মনে মনে ভাবে।
কোচিং-এ বসেই ফোনটা বার করে হোয়াটসঅ্যাপের স্ট্যাটাস চেঞ্জ করা শুরু করে রুপালি। আজ সকাল থেকে প্রচুর ইমেজ নিয়ে রিসার্চ করার পর শেষ পর্যন্ত একটা ইমেজকে ফাইনালাইস করেছে শতদীপের প্রতি ওর ভালোবাসা ডেডিকেট করার জন্য। ঝটপট হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করার পর পম্পাকে মেসেজ করে, “স্ট্যাটাসটা দেখ। ঠিক আছে তো?”
পম্পা উত্তর পাঠায়, “একঘর!!”
এবার রুপালি মেসেজ পাঠায়, “বলছি শোন, আজকে কোচিং শেষ হবার পর আর আমার জন্য ওয়েট করার দরকার নেই। ইটস আ ডাউট অ্যাবাউট মাই লাইফ রাইট; কতক্ষণ টাইম লাগতে পারে নো আইডিয়া!! বেটার তুই বাড়ী চলে যাস; আমি বাড়ী পৌঁছে তোকে কল করবো!!”
“ওঃ!! অলরেডি মনমে লাড্ডু ফুটিং!! ওকে জানেমন.. রাতে কথা হবে; জানাস কি হল!!”- পম্পা উত্তর দেয়।
যথারীতি, পড়ানো শেষ করে শতদীপ সবাইকে এম. এস. সি. অনার্সের জন্য অল দা বেস্ট উইশ করে। “কারোর কোনো ডাউট আছে?”- প্রতিটা কোচিং সেশনের শেষে করা প্রশ্নটা শেষবারের মত ফাইনাল পরীক্ষার আগে সবার সামনে রাখে।
যা ভাবা তাই কাজ; শতদীপের প্রশ্ন শেষ হবার আগেই একজন হাত তুলে জানান দেয় যে তার ডাউট আছে। পুরো কোচিং ফাঁকা হয়ে গেলে পরে শতদীপ রুপালির সামনে এসে বসে; “বল, কি ডাউট আছে?”
“পড়া নিয়ে নয়; লাইফ নিয়ে”- রুপালি উত্তর দেয়।
“বাবারে!! প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার আগে এত হেঁয়ালি?? বল, কি দাবি তোর?”
“দাবিটা পরে রাখবো; আগে হোয়াটসঅ্যাপটা খুলে আমার স্ট্যাটাসটা দেখ!!”
শতদীপ ফোনটা জাস্ট হাতে নেয়; হোয়াটসঅ্যাপ না খুলেই বলে ওঠে; “দেখলাম.. এরপর কি??”
“তুমি কি সত্যিই কিছু বোঝো না নাকি বুঝে না বোঝার ভান করো?? আচ্ছা যখন এটাই চাইছো যে আমি সবকিছু খুলে বলি; তাহলে শোনো, স্ট্যাটাসটা তোমাকে ডেডিকেট করা; আই লাভ ইউ!!”
“হুম মনেই হচ্ছিলো যে পড়ার বাইরেই কিছু হবে!! আজকে যা পড়ালাম আদৌ কিছু মন দিয়ে শুনেছিস?”......
শতদীপ আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিলো; রুপালি থামিয়ে দেয়, “ওইসব এখন আমার শোনার মুড বা ইন্টারেস্ট কোনটাই নেই। আমি যে কথাটা বললাম; সেটার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বলার থাকলে বলো!!”
“হুম!! এটাই বলার আছে যে; তোর সাথে যখন আমি শপিং করতে বা হোটেলে খেতে যাই; তখনও আমি তোর স্যারই থাকি। প্লিজ সেটা থেকে অন্য কোনো মিনিং বার করিস না! আর ২ সপ্তাহ পরেই পরীক্ষা; প্লিজ ওখানে কনসেনন্ট্রেট কর!!”
“তার মানে শপিং করতে গিয়ে আমি নীল রঙের টপ বা কুর্তি চয়েস করলে তোমার চোখে যে একটা অনাবিল আনন্দ দেখতে পেতাম; সেই যে তুমি বলতে, তোকে নীল রঙে সবচেয়ে বেশী সুন্দর লাগে, বিয়েতেও নীল বেনারসি পরিস.... সেটা তুমি আমার স্যার হিসেবে বলতে? তাইতো? বেশ!! কথাটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে দাও; আমি চলে যাচ্ছি। যখন থেকে প্রোপোজ করেছি, আমার চোখের দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলছো!! কেন?”
“হ্যাঁ; স্যার হিসেবেই বলতাম। প্লিজ এখন এইসব মাথায় আনিস না!! ভাব তো, তুই ক্লাস সেভেনে ভূগোলে ফেল করেছিলি; আর সেখান থেকে উঠে এসে এম. এস. সি. ফার্স্ট ইয়ারে সেভেনটি পারসেন্ট মার্কস পেয়েছিস; কতজনের এই ক্ষমতা থাকে? প্লিজ আবারও বলছি, পরীক্ষাতে কনসেনন্ট্রেট কর! এবার আমার কথা না শুনলে কিন্তু আমি কাকু কাকিমা’কে ফোন করে সবকিছু জানাতে বাধ্য হব!!”
“সত্যিটা স্বীকার করার গাটস নেই; অ্যাটলিস্ট না-টা তো চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারতে; ঠিক আছে আমি আসছি!!”- কথাটা বলেই রুপালি কোচিং-এর ঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে দ্রুত সাইকেলের লক খোলা শুরু করে।
এরপর সাইকেলে উঠে জানলার কাছ থেকে শতদীপের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে ওঠে-“স্যার!!!! থ্যাঙ্ক ইউ!!মনে যেটুকু ডাউট ছিলো, সেটা ক্লিয়ার করে দেওয়ার জন্য..!!”- কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সাইকেল নিয়ে রাস্তার ভিড়ে মিশে যায় মেয়েটা।
****
শেষ ৫ বছরে আজ প্রথমবার, রুপালি বাড়ী ফেরার সময় ওকে সাবধানে যাওয়ার কথা বলার সুযোগ পায়নি শতদীপ। ও চলে যাবার পর আনমনা হয়ে উপরে এসে মায়ের প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে মাকে টি. ভি.-র সামনে বসিয়ে দিয়ে; আলমারি থেকে জমিয়ে রাখা গিফটপ্যাকের ঝুলি বার করে একমনে তাকিয়েছিলো ওগুলোর দিকে। “আদৌ আমি কাজটা ঠিক করলাম তো? টিচারের মত ভাবতে গিয়ে নিজের ভালোবাসার জায়গাটাকে কম্প্রোমাইজ করে ফেললাম না তো?”- এইসব হাজার ভাবনার বহর চলছিলো ওর মনে।
“কি রে? রাতে খাবার বানাবি না? সাড়ে ৯ টা তো বাজতে চলল....”- হঠাথ মায়ের ডাকে ঘোর কাটে শতদীপের।
প্রথমে ভাবছিল অমলকাকুকে ফোন করে রুপালি ঘরে পৌঁছেছে কিনা সেটা যেনে নিয়ে তারপর খাবার বানাতে যাবে। কিন্তু তাহলে যে মায়ের শুতে দেরী হয়ে যাবে; আগে রুটিটা করে নিয়ে মা’কে খাওয়ানোর পর শুইয়ে দিয়ে তারপর ফোন করে নেবে; ঠিক করে নেয় ও; “হ্যাঁ মা যাচ্ছি; ১৫ মিনিটে খেতে দিচ্ছি তোমাকে দাঁড়াও”।
জাস্ট মা’কে শুইয়ে দিয়ে ঘরের লাইটটা বন্ধ করছিল শতদীপ; হঠাথ ওর পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করা শুরু করে। “গুড নাইট মা”; মা’কে গুড নাইট কিসি করে ব্যালকনিতে এসে ফোনটা পকেট থেকে বার করে; স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে, অমলকাকু_রুপালি কলিং।
বারান্দার দেওয়ালঘড়িটার দিকে তাকায় ও; রাত্রি সাড়ে ১০ টা বাজছে। হঠাথ এত রাতে ফোন; তাহলে রুপালির প্রোপোসালে ও ওইরকম ভাবে রিঅ্যাক্ট করাতে মেয়েটা সত্যি সত্যি কোনো ভুলভাল স্টেপ নিয়ে ফেলল না তো; ভাবতে ভাবতে অমলকাকুর ফোনটা রিসিভ করে শতদীপ, “হ্যাঁ, কাকু বলুন!!”
“বলছিলাম কি, আজকে কখন শেষ করেছো পড়ানো?”
“কেন কাকু; অলমোস্ট সেম টাইমেই!! ওই ধরুন সাড়ে আটটা নাগাদ। কেন; রুপালি কি ফেরেনি এখনো?”
“না গো; সেইটাই তো ভাবছি। কোনোদিন তো এত দেরি করে না। ফোন করলেও কেটে দিচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে একটু জানিয়ে যেতে পারে.. কি যে করে না মেয়েটা!!”- অমলবাবুর কথাবার্তায় ওনার দুশ্চিন্তার মনোভাবটা স্পষ্ট হয়।
ব্যাপারটা শুনে শতদীপ প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নেয়, “ও আচ্ছা!! হতে পারে হয়তো কারো বাড়ীতে গেছে গ্রুপ স্টাডি করতে.. পরীক্ষা তো সামনেই! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন কাকু; আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি.... আধ ঘণ্টা সময় দিন আমাকে; আমি আপনাকে জানাচ্ছি!!”
“ঠিক আছে বাবা!! যখনই কিছু জানতে পারবে; আমাকে জানিও!!”- অমলবাবুর কাতর আর্জি শতদীপকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়।
অমলকাকুর ফোনটা রাখার পর ৩০ সেকেন্ডের জন্য একদম ব্ল্যাংক হয়ে যায় শতদীপ। কনফিডেন্টলি ব্যাপারটা দেখে নেবে; কাকুকে সেটা কনভিন্স করে দিলেও রুপালি যে এরকম একটা স্টেপ নিয়ে নেবে, সেটা হজম করতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যায় ওর। ইমোশনাল ধাক্কাটা সামলে ওঠার পর প্রথমেই মায়ের বেডরুমের দরজাটা একটু ফাঁক করে ভিতরে দেখে; হ্যাঁ, মা ঘুমিয়ে গেছে। নিজের খাবারটা ফ্রিজে ঢোকায়; কোনওরকমে একটা টি-শার্ট গায়ে চাপিয়ে স্পিড ডায়াল থেকে রুপালির নম্বরটা ডায়াল করে; এবং যা হওয়ার তাই হয়, রুপালি ফোনটা কেটে দেয়।
তাড়াতাড়ি একতলায় নেমে বাড়ী বাইরে থেকে লক করে নিজের সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শতদীপ। কোথায় যাবে; কিভাবে খুঁজে বার করবে রুপালিকে.. কোনো ধারণা নেই; তবু সাইকেলে চেপে উদ্দেশ্যহীন ভাবে রওনা দেয় ও।
****
“রুপালি, প্লিজ পাগলামো করিস না! তোর আমার উপর রাগ আছে; তুই সেটা আমার সাথে বুঝে নে! কাকু কাকিমা’কে টেনশনে রাখিস না প্লিজ; তোর পায়ে পড়ি”- হোয়াটসঅ্যাপে রুপালিকে মেসেজটা পাঠিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে পম্পাকেই প্রথম ফোনটা করে শতদীপ।
“হ্যালো শত দা!! কি হল হঠাথ এত রাতে ফোন করছো? সব ঠিক আছে তো?”
“সেটা তো তুই বলবি আমাকে! রুপালি বাড়ী ফেরেনি এখনো। আজকে কি তোরা একসাথে বাড়ী যাসনি?”
পম্পা খানিকক্ষণ থতমত খাওয়ার পর বলা শুরু করে, “না মানে ওর তো আজকে তোমার থেকে কি নাকি একটা খুব বড় ডাউট ক্লিয়ার করার ছিল আলাস্কার জলবায়ু না কি সম্বন্ধে; তাইজন্য আমাকে বলল যে ফিরতে দেরি হবে; ওয়েট করতে না....”
“বাহ! অপূর্ব! আলাস্কার জলবায়ু বি. এস. সি. তে ছিল; এম. এস. সি. তে নেই। মিথ্যে বলবি ঠিক আছে; একটু গুছিয়ে তো বল! আর শোন, উনি যখন কোচিং-এ বসে হোয়াটসঅ্যাপে স্ট্যাটাস চেঞ্জ করছিলেন আর তোর সাথে আলোচনা করছিলেন, আমি পুরো ব্যাপারটাই দূর থেকে লক্ষ্য করেছি। ইনফ্যাক্ট ওর স্ট্যাটাসটাও তক্ষুনি দেখেছি আর সাথে সাথে বুঝেছি যে, কাজটা আমার জন্যই করা হয়েছে। শুধু যাতে ফোকাস না নড়ে যায়, সেইজন্য ওনাকে এইসব নিয়ে ভাবনা ছেড়ে পরীক্ষা নিয়ে কনসেনট্রেট করতে বলেছিলাম.... কিন্তু উনি তো নিজের মর্জির মালিক.... কি আর বলবো!! তাই ন্যাকামো ছাড়.... প্লিজ জলদি বল ও কোথায়...!!”
শতদীপের কথাগুলো শুনে পম্পাও নিজের খুশী চাপতে পারে না; “আরে ওয়াহ!! শত দা; তুমি তো বিশাল ছুপা রুস্তম দেখছি! সব যেনে বুঝে তারপরও.... পারো বটে তোমরা ২ জন!! দাঁড়াও আমি মহারানীকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছি যে তিনি কোথায় ধ্যানে বসেছেন..!! চিন্তা কোরো না।”
“আবার বলিস না আমি জানতে চাইছি; তাহলে দেখবি তোকেও হয়তো জানাবে না!!”
“আরে ডোন্ট চিন্তা; ডু ফুর্তি.... আমি আছি তো!! সব ভালো হবে.. জানাচ্ছি দাঁড়াও।”- পম্পার আত্মবিশ্বাসে ভর করে একটু হলেও নিশ্চিন্ত হয় শতদীপ।
২ মিনিটের মধ্যে শতদীপকে কলব্যাক করে পম্পা। “শত দা, যতদূর বুঝলাম; স্টেশন রোড ধরে চৌরঙ্গির দিকে যেতে যে ১৭ নম্বর রেলগেটটা পড়ে, ওর কাছাকাছিই কোথাও রয়েছে রুপালি। আমাকে হাজার বার এইটা প্রমিস করালো যে, ওর বাড়ীর লোককে জানালেও আমি যেন ও কোথায় রয়েছে সেটা তোমাকে কিছুতেই না জানাই..”।
“দেখ, ইমম্যাচিওরিটিরও একটা লিমিট থাকে। মানলাম, আমি সেই রেসপন্সটা দিইনি যেটা ও এক্সপেক্ট করেছিলো। কিন্তু তাই বলে এত রাতে ওরকম একটা জায়গায় একা একটা মেয়ের বসে থাকা কি যুক্তিযুক্ত? মাঝেমধ্যেই ওখানে জুয়ার ঠেক বসে..তুই-ই আমাকে বল; ভগবান না করুক; আজকে কিছু একটা হয়ে গেলে তার দায়িত্ব কে নেবে? তোরা শুধু বড়ই হয়েছিস; ম্যাচিওর আর হোসনি......”- রেগে গিয়ে বলে ওঠে শতদীপ।
কখনো পড়া না পারলে বা কোচিং-এ ভুলভাল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেও শত’দা কে এতটা রাগতে দেখেনি পম্পা। তাই শতদীপের রিঅ্যাকশন শুনেই খানিকটা ঘাবড়ে যায় ও, “সরি শত দা! তুমি খোঁজ নেবার আগেই আমার ওকে একবার ফোন করা উচিৎ ছিল; তাহলে হয়তো এত রাত অবধি ওখানে বসে থাকার প্ল্যানটা আমি আগেই জানতে পারতাম। আর জানলে ওকে আটকানোর চেষ্টা অবশ্যই করতাম!”
“ঠিক আছে; বাদ দে এখন। আমি দেখছি কি করা যায়। তুই শুধু একটা হেল্প করিস; আমি ওখানে পৌঁছে রুপালিকে দেখতে পেলেই তোকে মেসেজ করে দেব; তুই সঙ্গে সঙ্গে ওর বাবাকে ফোন করে বলে দিস; যে কোচিং থেকে বেরিয়ে ও তোদের বাড়ীতে ছিল আর তোরা গ্রুপ স্টাডি করছিলি! ও জাস্ট তোদের বাড়ী থেকে বেরিয়েছে; হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ী পৌঁছাবে। দেখিস আবার বাড়িয়ে চরিয়ে বলতে গিয়ে আলাস্কার জলবায়ুর মত ঘেঁটে ঘ করে ফেলিস না যেন!!”
“না না তুমি চিন্তা কোরো না; আমি ম্যানেজ দিয়ে দেব....!!”
পম্পার ফোনটা রাখার সাথে সাথে শতদীপ সাইকেল নিয়ে চৌরঙ্গির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
****
১৭ নম্বর রেলগেটের কাছাকাছি পৌঁছে রেললাইনের ধার ঘেঁষে রুপালিকে খুঁজতে শুরু করে শতদীপ। রেললাইনের ২ দিক বরাবর অনেকক্ষণ ধরে খুঁজলেও রুপালিকে দেখতে পায় না ও। এদিকে সময়ও থেমে নেই; অমলবাবুর থেকে চেয়ে নেওয়া আধ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে মাত্র আর ৫ মিনিটই বাকি আছে। কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতেই হঠাথ করে শতদীপের মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ আসে।
“তোমার ওপর রাগ নয়; বিশ্বাস ছিল! আর সেটা যে ভুল ছিল না, তুমি আমাকে খুঁজতে এসেই প্রমাণ করে দিয়েছো। আমি আমন্ত্রণ রেস্টুরেন্টের সেকেন্ড ফ্লোরে বসে আছি; এখানকার জানলা দিয়ে তোমাকে রেললাইনের ধারে দেখতে পাচ্ছি। প্লিজ এখানে চলে এসো। সময় নিয়ে এসো; ফ্যামিলি রেস্টুরেন্টে একদম সিকিওর এনভায়রনমেন্টে বসে আছি।”- রুপালির মেসেজ দেখতে পেয়েই শতদীপ সাইকেল নিয়ে সোজা রেস্টুরেন্টের দিকে দৌড়য়।
রেললাইনের ধারে যে জায়গাটাতে ও রুপালিকে খুঁজছিল; সেখান থেকে আমন্ত্রণ রেস্টুরেন্টের দূরত্ব মেরেকেটে ২০০ মিটার। আদৌ মেসেজটা রুপালিই করেছে নাকি ওর ফোন থেকে অন্য কেউ সেটা পাঠিয়েছে, তা ভাবতে ভাবতেই সাইকেল নিয়ে অলমোস্ট দৌড়ে দৌড়ে রেস্টুরেন্টের সামনে পৌঁছায় শতদীপ। সাইকেলটা কোনোমতে স্ট্যান্ড দিয়ে রীতিমত দরদর করে ঘামতে ঘামতে হোটেলের রিসেপশনে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করে, “রুপালি সেনগুপ্তার নামে কোন টেবিল বুকড আছে?”
“স্যার, ওই নামে তো কোনো টেবিল বুকড নেই, তবে শতদীপ সাহা’র নামে টেবিল বুকড আছে, যেখানে রুপালি সেনগুপ্তা ওয়েট করছেন।”
“আমিই শতদীপ সাহা; টেবিল নাম্বার প্লিজ!”
“স্যার; ফার্স্ট ফ্লোর; সেকেন্ড রো; তিন নম্বর টেবিল। যাবার আগে কাইন্ডলি একটা আই কার্ড দেখিয়ে যান প্লিজ; আসলে রাত্রি ১১টার পর কারো নামে টেবিল বুকড থাকলেও আমরা আই কার্ডের ডুপ্লিকেট কপি নিয়ে রাখি.. জাস্ট ফর সিকিউরিটি পারপাস!”
নিজের আধার কার্ডটা স্ক্যান করিয়ে প্রায় ছুটে টেবিলে এসে পৌঁছয় শতদীপ। রুপালিকে দেখতে পেয়ে চরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও। মেয়েটা কোচিং থেকে বেরিয়ে বাড়ী যায়নি; রুপালির কামিজটা দেখে বুঝতে পারে শতদীপ। সত্যিই মেয়েটা আস্ত পাগল; কেন যে রুপালির ওর মত একটা লাজুক, মুখচোরা স্বভাবের ছেলেকে পছন্দ; ভেবে কুলকিনারা পায় না শতদীপ নিজেও।
“কি হল এরকম অস্বাভাবিক ভাবে হাঁপাচ্ছ কেন; তুমি কি পুলিশের তাড়া খেয়ে এলে? সাইকেল নিয়েও সিগনাল ব্রেক করা যায় নাকি?”- রুপালি একগাল মিষ্টি হাসি নিয়ে প্রশ্নটা করাতে ঘোর কাটে শতদীপের।
“তোর কি মাথায় ছিট-টিট আছে নাকি? এইরকম কে করে? দুনিয়াশুদ্ধু লোককে টেনশনে ফেলে এইখানে বসে কমেডি করছিস? কাকুর দুশ্চিন্তায় কি অবস্থা হয়েছে জানিস?”- রেগে গেলেও গলা নামিয়ে রুপালিকে প্রশ্নগুলো করে শতদীপ; কেন যে ওর উপর রাগ দেখাতে পারে না; সেটা নিজেও জানে না ও।
“দেখ, আমি মানছি আমি দুনিয়াশুদ্ধু লোককে টেনশনে ফেলেছি। কিন্তু তুমি যদি ভেবে থাকো আমি এখানে সুইসাইড করতে এসেছিলাম, তাহলে সেটা তোমার ভুল। আমি যথেষ্ট পজিটিভ মানুষ; তোমার সঙ্গে সারাজীবন বাঁচতে চাই! আমার প্রোপোজালে তুমি ভুল রিঅ্যাকশন দিলে; তার জন্য আমি ভুক্তভোগী হব; সেটা হবার নয় বস! কিন্তু হ্যাঁ, এটা করা ছাড়া আজকে তুমি আমার কাছে আর কোনো অপশনই রাখোনি। এত লজ্জাবতী লতা হলে কি করে চলবে বল? তোমার মনে আমার জন্য যে ফিলিংস আছে, সেটা আমি তোমার চোখের দিকে তাকালে বুঝতে পারি। কবে থেকে ওয়েট করছি যে এবার হয়তো তুমি প্রোপোজ করবে; কিন্তু কোথায় কি? শেষ অবধি আমি নির্লজ্জের মত সামনে থেকে প্রোপোজ করার পরও তোমার মুখ থেকে সত্যিটা বের করতে পারলাম না; তাই জন্য এইসব করতে হল আর কি!”
কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার বলে ওঠে রুপালি; “বাবাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না অত; তোমাকে নিচে দেখতে পাওয়ার পরই আমি পম্পাকে ফোন করে বলে দিয়েছি; ও বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে যে আমি ওর বাড়ীতে আরও বেশ খানিকক্ষণ কাটিয়ে ডিনার করে ফিরবো। সো জাস্ট চিল!”
“এবার একটু রিল্যাক্স করে আমার সামনে বস তো; একটু প্রাণভরে তোমাকে দেখি”; হঠাথ শতদীপের হাতটা টেনে ধরে ওকে নিজের একেবারে পাশে বসিয়ে নেয় রুপালি।
“আরে আরে পাগল নাকি? পাবলিক প্লেসে এইসব কে করে?”- লজ্জায় শতদীপের মুখ লাল হয়ে যায়।
“আমার মাঝেমধ্যে সত্যিই সন্দেহ লাগে জানো তো! হয় তুমি ছেলে নও; নাহলে যে বয়সে বায়োলোজির একটা স্পেসিফিক চ্যাপ্টারের ঠিকঠাক ইমপ্লিমেন্টেশন করলে তোমার ২ বাচ্চার বাবা হয়ে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেও শুধু জিওগ্রাফি পড়িয়ে যাচ্ছো বলে তোমার রস-কস সব শুকিয়ে মাথায় উঠে গেছে! কি ঠিক তো?”- কথাগুলো বলতে বলতেই মুখে একটা নিষ্পাপ হাসি নিয়ে শতদীপের বুকে আঙুল দিয়ে খোঁচাতে শুরু করে রুপালি।
“রুপালি; প্লিজ এরকম করিস না। মানছি রাত হয়ে গেছে বলে লোকজন বেশী নেই; তবু পাবলিক প্লেস তো; আমার বড্ড লজ্জা লাগছে!”
“আরে কি এমন করেছি বল তো; বুকে কাতুকুতু দিলে আবার কোন ছেলে লজ্জা পায় কে জানে! এই হচ্ছে বুড়ো বয়সে ভার্জিন থাকার সাইড এফেক্ট বুঝলে তো; ভালো কথা বলছি; এখনো পর্যন্ত তন-মন থেকে শুধু তোমাকেই চাই, মন’টাকে আপন করে নাও; তন’টাও তুমিই পাবে!”
কথাগুলো বলতে বলতে রুপালি প্রাণ খুলে হাসছিল। শতদীপও ওকে কোনোদিন এত প্রাণবন্ত দেখেনি; তাই ও-ও একটা অবাক মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে ছিল রুপালির দিকে। ওর উপস্থিতি যে কাউকে এতটা প্রাণোচ্ছল করে তুলতে পারে, আজ রুপালিকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হত শতদীপের পক্ষে!
“কি হল!! কি এত আকাশকুসুম ভাবছো বল দেখি! প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা আগে আই লাভ ইউ বলেছি; উত্তরটা কি পরের জন্মে দেবে ভাবছো? শুনেছি লোকে মনের কথা লুকিয়ে পেটের মধ্যে রাখে; তুমি তো দেখছি ইন্টেস্টাইনে লুকিয়ে রেখেছো!”
“দেখ রুপালি; আমি তোর জন্য কি ফিল করি, সেটা তুই ভালো করেই জানিস! আর সেটা ফিল করি বলেই চাই, যে জিনিষগুলোকে আমি চাইলেও ফাইনান্সিয়াল কারণে অ্যাচিভ করতে পারিনি; সেগুলো তুই অ্যাচিভ কর। প্লিজ পি. এইচ. ডি.-টা করিস; আমার অন্য কোনো স্টুডেন্টের থেকে কোনো এক্সপেকটেশন না থাকলেও তোর থেকে আছে; এটাকে ভালোবাসার দাবিও বলতে পারিস।”
“উফ! তুমি সুযোগ পেলেই খালি টিচার মোডে চলে গিয়ে জ্ঞান মাড়ানো শুরু কর কেন বল তো? আমরা রেস্টুরেন্টে বসে আছি, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমি দুনিয়ার সবচেয়ে লাজুক লোকটাকে রীতিমত ব্ল্যাকমেল করে ডেটে নিয়ে এসেছি! এটা কোচিং সেন্টার নয়; তাই প্লিজ পায়ে পড়ি, প্রপার রিপ্লাই দাও যাতে আমারও মনে একটু শান্তি আসে!”
“ওকে! তুই সবই জানিস; তাও বলছি- আই অলসো লাভ ইউ...... আ হেল লট! তবু জানিস তো........”- আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল শতদীপ; কিন্তু রুপালি থামিয়ে দেয়।
“ইয়েএএএএএএএএএএ!!!!!!!! দিস কলস ফর আ সেলিব্রেশন!”-উত্তেজনায় চিৎকার করে ওঠে রুপালি; একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠে যোগ করে, “কিন্তু ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট তো; বিয়ার বা শ্যাম্পেন তো সারভ হবে না; বিরিয়ানি দিয়েই কাজ চালাই আজকের দিনটা নাকি? ভালো করেই জানি না খেয়েই আমাকে খুঁজতে বেরিয়েছো!”
শতদীপ সায় দিতেই ওয়েটারকে ডেকে নিয়ে মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন রেজালা অর্ডার দেয় রুপালি। ওরা ২ জনেই এই রেস্টুরেন্টে আগেও বহুবার খেতে এসেছে; ওয়েটার থেকে শুরু করে হাত ধোয়ার জায়গা অবধি সবকিছু ওদের ২ জনেরই খুব ভালো ভাবে চেনা; তবু আজ পুরো ব্যাবস্থাপনাটাই ২ জনের কাছে নতুন মনে হয়! এই জায়গাটায় যে এত সুন্দর একটা রোমান্টিক অ্যাম্বিয়েন্স আছে, সেটা নিজেদের ফিলিংস একে অপরের সঙ্গে শেয়ার না করলে হয়তো ২ জনের কেউই উপলব্ধি করতে পারতো না। জানা-অজানা অনেক ব্যাপার নিয়েই ভালোবাসার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্প করতে করতে কখন যে সময় পেরিয়ে যায়, ২ জনের কেউই বুঝতে পারে না।
হঠাথ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রথম সম্বিৎ ফেরে রুপালিরই। “এই শত’দা, প্রায় বারোটা বাজতে চলল। এবার আমি বাড়ী না ফিরলে পম্পা আর সত্যিই বাবাকে ম্যানেজ দিতে পারবে না! চল বের হওয়া যাক!”
শতদীপ ওয়েটারকে ডেকে বিলটা মিটিয়ে দিয়ে বলে ওঠে, “সে তো বুঝলাম! আমাকে জাস্ট একটা কথা বল, তুই রেস্টুরেন্টে বসে ছিলি, সেটা না জানিয়ে পম্পাকে এটা কেন জানিয়েছিলি যে রেললাইনের ধারে কোথাও বসে আছিস?”
“দেখ, আমি শিওর ছিলাম যে আমার খোঁজ না পেলে তুমি ওকে ফোন করবেই; আর ওকে আমি যতই প্রমিস করাই, তুমি জানতে চাইলে ও আমার ব্যাপারে ঠিকই তোমাকে জানিয়ে দেবে। কিন্তু রেস্টুরেন্টের ব্যাপারে ওকে জানিয়ে দিলে তুমি ডাইরেক্টলি আমাকে এখানে এসেই খুঁজে পেয়ে যেতে; তাহলে তুমি সত্যিই আমার জন্য কতটা কেয়ার করো, সেটা তো আমি অতটা বুঝতে পারতাম না!! বলিনি বলেই তো জানলা দিয়ে তোমাকে রেললাইনের ধার ঘেঁষে ওভাবে পাগলের মত ঘুরে বেড়াতে দেখলাম; আর তুমিও যে আমাকে পাগলের মত ভালোবাসো, সেটাও আমার আর বুঝতে বাকি রইল না!!”
“পাকা বুড়ি একটা!! তবে অন্য কারো নয়; আমার..!!”- রেস্টুরেন্ট থেকে বেরনোর পর কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে রুপালির মাথাটা জড়িয়ে ধরে শতদীপ।
“হায় ম্যায় মারজাভা!! এইটাই তো চাইছিলাম। এবার আমি শান্তিতে কনসেনট্রেট করে পরীক্ষাটা দিতে পারবো।”- রুপালি কথাগুলো বলার পর ২ জনেই সাইকেল নিয়ে রওনা দেয় বাড়ীর উদ্দেশ্যে।
প্রথমবার রুপালিকে ছাড়তে এসে ওদের বাড়ীর প্রায় ১ কিলোমিটার আগে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে পরে ২ জন। নীরবতা ভাঙে শতদীপই, “দেখ ২ টো কথা বলার আছে। প্রথমত, প্লিজ পরীক্ষাটা ভালো করে দিস। এইটুকু তোকে করতেই হবে, আমার জন্য; আমাদের জন্য! দ্বিতীয়ত, এম. এস. সি. -টা কমপ্লিট করলেই তোর শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার সমান হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যতে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কাকু-কাকিমা’র কিছু রিসারভেশন থাকতেই পারে; তারা তো বয়সে বড়, তাই তাদের মতামতটাকে যোগ্য সম্মান দিয়েই আমাদের এগোতে হবে..!!”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর আবার বলে ওঠে শতদীপ, “আসলে; সত্যি কথা বলতে, এই দ্বন্দ্বটা সবসময়ই আমার মনের মধ্যে চলে বুঝলি তো! আজ অবধি কোনোদিন স্বীকার হয়তো করিনি; কিন্তু, তুই-ই আমার মনখারাপের ভালোলাগা, তুই-ই আমার কাছে দাদা-বৌদির বিরিয়ানি, তুই-ই আমার কাছে ‘জব উই মেট’-এর গীত, তুই-ই আমার অষ্টমীর অঞ্জলিতে শাড়ির কল্পনা, তোর অ্যাবসেন্সই আমার কাছে স্যাড সং শোনার একমাত্র কারণ! কখন যে তোকে স্টুডেন্ট ভাবা ছেড়ে মনের মণিকোঠায় জায়গা দিয়েছি, আমি নিজেও জানি না। কিন্তু; সেইসঙ্গে এটাও ঠিক যে, আজকে আমার কোচিং সেন্টারের পশার জমার পিছনে অমলকাকুর বিরাট অবদান আছে। যখন আমার না সেই লেভেলে নামডাক ছিল না এক্সপিরিয়েন্স; তখন অমলকাকু ভরসা করে তোকে পড়ানোর জন্য আমায় চয়েস করেছিলো, যার জন্য আজকে আমি এই জায়গায় পৌঁছেছি। তাই শেষ ৩ বছর ধরে প্রতিটা স্পেশাল অকেশনে তুই গিফট পাঠাচ্ছিস; সেটা জানলেও আমি গিফটগুলোকে জমিয়ে রেখে দিয়েছি; কোনোদিন খুলে দেখিনি; বাই চান্স আমার ফিলিংগুলো যদি প্রকাশ্যে চলে আসে এই ভয়ে। আজকে তুই প্রায় জবরদস্তি করলি বলে কথাগুলো বলে দিলাম.... আর বলার পর মন থেকে বেশ হালকা লাগছে বিশ্বাস কর!!”
বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে শতদীপের কথা শুনছিল রুপালি। “আরে!! মনের মধ্যে আমাকে নিয়ে এতকিছু লুকিয়ে রেখেছো সে তো আজকে প্যাঁচে না ফেললে জানতেই পারতাম না! আর শোনো, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা তোমার সমান হোক কিংবা তোমার থেকে বেশী; আমি তোমাকেই ভালবাসবো। পি. এইচ. ডি. করার কথা বলছিলে না; অবশ্যই করবো, যদি তুমি পাশে থাকো; টিচার হিসেবে নয়, হাসব্যান্ড হিসেবে। জীবনটা আমার, মানছি বাবা-মায়ের দেওয়া; কিন্তু আমি কার সাথে সারাজীবন খুশী থাকবো, সেটা ডিসাইড করার রাইট একমাত্র আমার আছে! প্রোপোজ করে তোমার কাজ সহজ করে দিয়েছি, রেজাল্ট বেরোনোর আগেই বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে আমার হাত চাইতে আসবে....সারাজীবনের জন্য, মনে থাকে যেন!!”-কথাগুলো বলতে বলতে শতদীপকে জড়িয়ে ধরে রুপালি।
“আরে কেউ কাউকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরলে; তুমি যদি অন্যদিকের মানুষটার প্রতি সেম ফিলিং রাখো, তাহলে রেসিপ্রোকেট করতে হয়! রাত্রি সওয়া বারোটা বাজছে, রাস্তাঘাট শুনশান, একটা অলমোস্ট পারফেক্টলি সেক্সি মেয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছে, কেউ দেখার নেই.... অন্য কোনো ছেলে হলে না.... কি যে করে ফেলতো তার ইয়ত্তা নেই! আর তোমাকে দেখো, জড়িয়ে ধরতেও অনীহা.....! শত’বাবু, শুধু মনের মধ্যে ফিলিং রাখলেই চলে না, মাঝেমধ্যে সেটাকে এক্সপ্রেসও করতে হয়। আমি ভগবান নই; মানুষ! তাই আমাকে ভালবাসলে মানুষের মতই বাসো, প্লিজ!”- রুপালির থেকে ঝাড় খেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরার পর শতদীপকে মাথাটা একটু নামাতে বলে রুপালি; কপালে একটা গভীর চুমু দিয়ে আলিঙ্গনটাকে আরও দৃপ্ত করে বলে ওঠে, “থ্যাংকস শত’দা! থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং, লিটারালি। শুধু তোমার উপরে একটু কাজ করতে হবে, যাতে তুমি সন্যাসী মোড থেকে বেরিয়ে নরমাল মানুষের মত বিহেভ করতে পারো!”
২ জন ২ জনকে শেষ বারের মত বিদায় জানাবার পর বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
****
রুপালিদের এম. এস. সি. ফাইনালের প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা শেষ হতে আর মাত্র ১ সপ্তাহ বাকি। পরীক্ষা শেষ হবার পর ওর আর রুপালির রিলেশনের ব্যাপারে কিভাবে অমলকাকুকে কনফেস করবে সেটা বেশ কয়েকদিন ধরে ভাবাচ্ছে শতদীপকে। এর মধ্যেই আজ হঠাথ অমলকাকু ফোন করে জিজ্ঞাসা করেছে যে, শত’রা বাড়ীতে আছে কিনা; শতদীপ হ্যাঁ বলাতে জানিয়েছে যে বিকেলে দেখা করতে আসবে। এর আগে কখনো পরীক্ষা চলাকালীন কাকু দেখা করতে আসেনি, হঠাথ আজ কেন আসছে দেখা করতে; সেটাও ভাবছিল শতদীপ।
মা’কে টি. ভি. চালিয়ে দিয়ে ব্যালকনিতে বসেছিল শতদীপ। ক্লাস এইট থেকে এম. এস. সি. পর্যন্ত সবার পরীক্ষার মরসুম বলে এই মাসটা ওর কোচিং প্রায় বন্ধই থাকে বলা চলে। হঠাথ নীচে দরজার কাছে সাইকেলের বেল বাজলে; ঝুঁকে দেখলো যে অমলকাকু এসেছে। মা ড্রয়িং রুমে বসে টি. ভি. দেখছিল বলে কাকুকে মায়ের বেডরুমে এসে বসতে বলে ও।
“চা খাবেন তো? চিন্তা নেই ২ জনের জন্যই বানাচ্ছি”- কাকুকে বসতে বলে চা করতে যায় শতদীপ। বানানো হয়ে গেলে ২ কাপ চা নিয়ে কাকুর সামনে চেয়ারটা টেনে নিয়ে এসে বসে ও, “হঠাথ পরীক্ষা শেষ হবার আগেই দেখা করতে এলেন? কি ব্যাপার?”
“ব্যাপারটা বেশ জটিল বুঝলে তো; ভাবছি এই ব্যাপারে তোমার থেকে সাহায্য চাওয়াটা উচিৎ কাজ হবে কি না!”
“অত ভাববেন না কাকু, বলুন।”
“আসলে কি জানো তো বাবা, শ্যামনগরে আসার পর নেহেরু মার্কেটে বাড়ী করার আগে আমরা কৃষ্ণনগরে থাকতাম। ওখানে থাকাকালীনই আমার মায়ের সঙ্গে রাস্তার উল্টোদিকে থাকা সুশীলবাবুর মধ্যে বেশ একটা মা-ছেলে’র সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সুশীলবাবুর মা খুব কম বয়সে মারা যান, তাই উনি আমার মা’কে নিজের মায়ের মতই শ্রদ্ধা করতেন। আমি আর মিসেস ২ জনেই চাকরি করতাম বলে; আমার মা দিনের সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে বেশীরভাগ ওঁদের বাড়ীতেই সময় কাটাতেন। সুশীলবাবুর ছেলেকে নিজের নাতি বলে মনে করতেন উনি। আমরা যখন ওইখান থেকে চলে আসছি, তখন এই নাতি-ঠাম্মাই সবচেয়ে বেশী কান্নাকাটি করেছিল। তো আমার মা ওঁদের কথা দিয়ে এসেছিলেন যে, বড় হলে নিজের নাতি-নাতনির মধ্যেই বিয়ে দেবেন যাতে ২ পরিবার আবার এক হয়ে যায়।”
অমলকাকুর কথা শুনে শতদীপের পায়ের তলার মাটি সরতে শুরু করেছে অলরেডি। উনি বলে চলেন, “এখন মা মারা গেছেন প্রায় ৪ বছর হল, আমরাও ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই গেছিলাম বলতে পারো। হঠাথ দিন তিনেক আগে সুশীলবাবু ফোন করে ব্যাপারটা মনে করালেন। ওঁর ছেলে এখন এম. টেক. কমপ্লিট করে আই. টি. তে চাকরি করছে; ব্যাঙ্গালোরে সেটেলড। মাস তিনেকের মধ্যে কানাডার ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে পার্মানেন্টলি ওখানে সেটেল হবার প্ল্যান আছে ওর। তো সুশীলবাবু চান, বাইরে যাবার আগে ছেলের বিয়েটা মিটিয়ে নিতে। তিন মাস সময়টা তো খুবই ছোটো; পেপারে অ্যাড দিয়ে, সম্বন্ধ করে মেয়ে খুঁজে ছেলের বিয়ে দেওয়াটা বাস্তবে দেখতে গেলে অসম্ভব। তাই ওঁর রুপালির কথা মনে পড়েছে। রুপালি যখন ক্লাস থ্রি-তে পড়তো, তখন পর্যন্তও রুপালি আর সুজয়; মানে সুশীলবাবুর ছেলে নিজেদেরকে চিনতো আর কথাও বলত। আমি সুশীলবাবুকে রুপালির রিসেন্ট ফোটো পাঠিয়েছিলাম, সুজয় সেটা দেখে রুপালির সঙ্গে কথা বলার আগেই ওকে পছন্দ করে নিয়েছে..!!”
শতদীপের চিৎকার করে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছিলো; কিন্তু ও সংযম বজায় রেখে জিজ্ঞেস করে, “তো কাকু, এই ব্যাপারে আমি আপনাকে হেল্প করতে পারি এটা আপনার কেন মনে হল?”
“আরে আমার না, রুপালি’র মনে হয়েছে। জানি পরীক্ষার সময়ে এইসব নিয়ে কথা বলেছি বলে তুমি একটু রাগ করবে; কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি শুধু একবার ওকে এই ব্যাপারে হিন্ট দেবার চেষ্টা করেছিলাম, ডিটেলসে কথাও বলিনি; পরীক্ষার কথা ভেবেই। তাতেই ও আমাকে বলল তোমার সাথে কথা বলতে। বলল; যদি তুমি বল, তাহলে ও বিয়েতে রাজি। তা তুমি কি হপ্তাখানেক পর পরীক্ষাটা শেষ হয়ে গেলে ওর সাথে এই ব্যাপারে একটু কথা বলে ওকে ব্যাপারটা বোঝাবে?”
“কাকু, আপনি পরীক্ষার মধ্যে এইসব ব্যাপারে রুপালির সঙ্গে কথা বলে একেবারেই ঠিক কাজ করেননি। আপনি তো চোখের সামনে দেখেছেন, ও ভূগোলে কোন জায়গায় ছিল, সেইখান থেকে আজকে কোন জায়গায় পৌঁছেছে। হ্যাঁ, হয়তো আমি কিছু পড়ার ট্রিকস শিখিয়েছি; কিন্তু ম্যাক্সিমাম ক্রেডিটটাই ওর। এম. এস. সি. কমপ্লিট করার পর পি. এইচ. ডি. করলে ওর সামনে কত অপশন খুলে যাবে একবার ভাবুন তো; কলেজ প্রফেসর, আই. আই. টি.-তে গেস্ট লেকচারার, মাইনিং কোম্পানির জব প্রোফাইল.... প্রত্যেকটাই যথেষ্ট সম্মানের পদ! ভাবার সময় কনস্ট্রাকটিভ ব্যাপারগুলোকেও একটু কনসিডার করুন প্লিজ!”- শেষের দিকে শতদীপের কথাগুলোতে একটু রাগ ফুটে ওঠে।
অমলবাবুও উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠেন, “দেখ শতদীপ, ব্যাপারটাকে খারাপ ভাবে নিয়ো না। আমার মেয়ে প্রতিভাবান, এটা তুমি বলতে বলেই আমি ওকে এতদূর অবধি পড়াশোনা করিয়েছি। এই পরীক্ষাটা পাশ করলে ওর শিক্ষাগত যোগ্যতা তোমার সমানই হয়ে যাবে; আর আমি জানি তুমি পড়িয়েছো মানে ও পাশ করবেই; ভালোভাবেই করবে। কিন্তু কেউ প্রতিভাবান মানে তো এই নয় যে সে সারাজীবন শুধু পড়াশোনাই করে যাবে! কত লোকেই তো এম. এস. সি.- পি. এইচ. ডি. করছে, কিন্তু যে চাকরিগুলোর কথা তুমি বললে, কতজন সেই চাকরি করার জায়গা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বল তো? তুমি নিজেকেই দেখে নাও; ভূগোলে এম. এস. সি. তো তুমিও করেছো; কিন্তু আজ অবধি তোমাকে টিউশন করেই জীবন কাটাতে হচ্ছে। যদি খারাপ লাগার জায়গাটাকে সরিয়ে রাখো, তাহলে ভেবে দেখ, আজও তোমার কোনো চাকরি নেই, তাই তোমার কোনো স্থায়ী রোজগার নেই। যখন যতজন স্টুডেন্ট পড়ে, তখন সেই অনুযায়ী রোজগার হয়। প্রায় ৩৩ বছর বয়স হতে চলল, তবু বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুঁজে পাচ্ছো না....এদিকে সুজয়কে দেখ, ২৮ বছর বয়সেই কেরিয়ারের একেবারে পিকে পৌঁছে গেছে; আমার মেয়েকে বিয়ে না করলেও ওর জন্য মেয়ের অভাব হবে না। আর আমার যখন ইচ্ছা আর ক্ষমতা ২ টোই আছে আমার মেয়েকে ভাল লাইফস্টাইল দেওয়ার, তাহলে অসুবিধাটা কোথায়?”
“দেখুন কাকু, আপনার আর আমার প্রিন্সিপালগুলো এতটাই আলাদা যে আমি যদি উত্তর গোলার্ধে থাকি, তাহলে আপনি থাকেন দক্ষিণ গোলার্ধে। তাই আপনি এখন যে মাইন্ডসেটে আছেন, আপনাকে আমি যা-ই বোঝাই, আপনার সেটা ভুলই মনে হবে। এই একই জিনিষ আপনাকে আমি রুপালির হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পর থেকে বুঝিয়ে যাচ্ছি, আমারও এখন নিজেকে ক্লান্ত লাগে। আমি এতবার মাঝে না দাঁড়ালে এতদিনে হয়তো ওর বিয়েটা হয়েই যেত। যেহেতু এখন রুপালি এম. এস. সি. কমপ্লিট করে ফেলবে আর ওর এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন আমার সমান হয়ে যাবে, তাই আপনার মনে হচ্ছে ওকে আর পড়ানোর প্রয়োজন নেই। কাকিমা চাকরি করেছেন; কিন্তু মেয়েকে চাকরি করার সুযোগ করে দিতে আপনার ক্ষমতা থাকলেও ইচ্ছা নেই। ঠিক আছে; আপনি বাবা, পয়সা আপনার খরচ হচ্ছে; ডিসাইড আপনি করতেই পারেন! কিন্তু আমাকে প্লিজ বলবেন না আপনার মেয়েকে বিয়েতে রাজি হবার জন্য বোঝানোর কথা; আমি পারবো না, সরি!”
“ঠিক আছে; আমারই ভুল। আজ অবধি তোমার কথা শুনে অনেকগুলো ভালো সম্বন্ধকে না করে দিয়েছি, কিন্তু আর নয়। মেয়ের বয়সও দিন দিন বাড়ছে। এখানে আসার আগে আমার মনে হয়েছিল, এম. এস. সি. পর্যন্ত যখনই মেয়ের বিয়ে নিয়ে তার টিচারের সাথে আলোচনা করতে গেছি, সে ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নেয়নি। এবার নিশ্চয়ই আলাদা কিছু হবে। কিন্তু টিচার তো টিচারই; তার মাথায় পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু চলে না! পড়াশোনার বাইরেও জীবনে অনেক কিছু করবার থাকে শতদীপ; আর সেগুলো সময়ে না করতে পারলেও জীবনে প্রচুর জটিলতা আসে.... আশা করি একদিন তুমি এটা বুঝতে পারবে!”- কথাগুলো বলার পর রাগে প্রায় গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যান অমলবাবু।
“অন্য ব্যাপারগুলো ঠিক আছে; তবে হঠাথ বাবা মারা গেলেন বলে আর আমার চিকিৎসার জন্য, তোকে পড়াশোনা ছেড়ে টিউশনি করা শুরু করতে হল; না’হলে তুইও আজকে পি. এইচ. ডি. করে বড় কোনো চাকরি করতিস- এই ব্যাপারটা ওনাকে বোঝানো উচিৎ ছিল।”- হঠাথ ড্রয়িং রুম থেকে মায়ের গলার আওয়াজ কানে আসে শতদীপের।
“কি হল মা তুমি টি. ভি. দেখছো না?”
“নাঃ! অনেকক্ষণ আগেই মিউট করে দিয়েছি। কথা বলার সময়, শেষের দিকে তোরা ২ জনেই শান্ত থাকার চেষ্টা করলেও ২ জনেরই গলার আওয়াজ একটু হলেও বেড়ে গিয়েছিল; তাইজন্যই আমিও শোনার চেষ্টা করছিলাম......!!”
ড্রয়িংরুমে চলে আসে শতদীপ, “তোমাকে কতবার বলেছি, আমি গার্জিয়ানদের সাথে কথা বলার সময় অনেকসময়ই কথাবার্তাটা একটু নরম-গরম হয়ে যায়, এসবে কান না দিতে। অলরেডি ৩ টে প্রেশারের ওষুধ খাও; ডাক্তার হাজারবার বলছে কোনোরকম টেনশনের মধ্যে না থাকতে! দাঁড়াও এবার থেকে ছুটির মরসুমেও এই ধরণের মিটিংগুলো নিচে পড়ার ঘরে রাখবো।”
“এই শোন, আমি শেষ ১০ বছর ধরে প্যারালিসিস পেশেন্ট, কিন্তু ৩৩ বছর ধরে তোর মা। তুই মেয়েদেরকে পড়াশোনা করাতে চাস বলে বাড়ীর লোকের সঙ্গে প্রায় ঝগড়া পর্যন্ত করিস। আর এরকম তো তুই শুধু আজকে না, অনেক বছর ধরেই করে আসছিস। আর শুধু যে রুপালির জন্য করিস, তাও নয়। আরও অন্য মেয়েদের জন্যও করেছিস। কিন্তু সেই মেয়েদের বাবা-মায়েরাই যখন মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়ে তোকে; তুই জীবনে কি করে নিলি সেটা নিয়ে কথা শোনায়, তখন মা হিসেবে আমার খারাপ লাগে! শুধু মনে হয়, শরীর ভালো থাকলে অন্তত এর থেকে বেশী সাহায্য করতে পারতাম তোকে। কাদের জন্য করছিস বাবু; কাদের অভিভাবক হওয়ার চেষ্টা করছিস? সেইসব মেয়েদের জন্য যাদের বাড়ীর লোকের তোর কাজের প্রতি কোনো সম্মানই নেই? মা হিসেবে আমি তো জানি, মাস্টার হয়ে তুই অনেকের অভিভাবক হতে পারিস, কিন্তু ব্যাক্তিগত জীবনে আমার পর তোর আর কোনো অভিভাবক নেই! কালকে আমি না থাকলে এইসব মেয়েরা তোকে সামলানোর জন্য তোর পাশে এসে দাঁড়াবে তো?”- রীনাদেবীর চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জল।
“ওইসব আমি ভাবি না মা! তুমি না থাকলে কি হবে, সেটা যাতে চিন্তা না করতে হয়; সেইজন্যই আমি আমার সীমিত ক্ষমতার মধ্যে এত কষ্ট করছি পয়সা রোজগার করার জন্য। তুমি ছাড়া আর কারোর উপর আমার কোনো এক্সপেকটেশন নেই। ওইজন্যই দেখ না, বছরের পর বছর পাওয়া গিফটগুলো যে রুপালি দেয় সেটা জানলেও ওইগুলো আলমারিতেই ভরে রাখি। সেই মেয়ের আমার থেকে এত এক্সপেকটেশন যে বাবা বিয়ের কথা বলাতেই সটান আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে; শত’দা আমাকে ভালোবাসে, ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। আরে! কি ম্যানেজ করবো; যে মানুষটা আমাকে, আমার কাজকে রেসপেক্ট করে না, তার কাছে আমি তার মেয়ের হাত চাইবো বিয়ে করার জন্য? আজকে শুধু আমায় কথা শুনিয়ে চলে গেছে, যদি তার মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা জানাতাম, তাহলে কথা শুনিয়ে তোমারও গুষ্টি উদ্ধার করে দিত; আর তারপর মেয়ের সাথে কি করত সে না হয় আর বললাম না! এখনো সেই যুগে পড়ে আছে যে, মেয়েকে না জানিয়ে তার ছবি হবু বরকে পাঠিয়ে দিয়ে তাকে পছন্দ করায়! সেদিন রাতে রুপালির সামনে ওর উপর আমার ফিলিংস শেয়ার করাটাই ভুল হয়েছে......!!”-কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে শতদীপ।
নিজেকে ফের খানিক সামলে মায়ের হাতটা ধরে নিয়ে বলে ওঠে, “প্লিজ মা, কথা দাও! তুমি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না! আমি জান লুটিয়ে দেবো তোমার জন্য, তোমাকে সুস্থ রাখতে চেষ্টার কোনো কসুর করবো না আমি! তুমি শুধু আমার পাশে থাকো; এইসব মতলবি, স্বার্থপর লোকেদের তাহলে আমি সারাজীবন ইগনোর করার শক্তি পাবো!”
****
রুপালি-পম্পাদের পরীক্ষা শেষ হবার পর প্রায় ১৫ দিনের বেশী সময় কেটে গেছে। শেষ প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষার আগেরদিন পর্যন্তও শতদীপ ওদের ব্যাচের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিয়মিত আপডেট দেওয়া নেওয়া করেছে। পরীক্ষা কেমন হচ্ছে, প্রশ্ন কেমন আসছে; খোঁজখবর নিয়েছে প্রায় সব ব্যাপারেই। এমনকি রুপালির পাঠানো পার্সোনাল মেসেজেরও খুব যত্ন করে রিপ্লাই দিয়েছে যাতে কোনোমতেই পরীক্ষার আগে মেয়েটার ফোকাস না ব্রেক হয়ে যায়। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হবার পর ও-ই প্রথম ব্যাচের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এক্সিট করেছে। এমনকি; তারপর থেকে রুপালির মেসেজও রিপ্লাই না করে; শুধু সিন করে রেখে দেয়। শেষ ১৫ দিনে রুপালির ফোন থেকে ওর ফোনে কম করে ১৫০ টা কল এসেছে; আর সেগুলোর প্রত্যেকটাই মিসড কল হয়ে গেছে শতদীপ রিসিভ না করায়। শতদীপের ব্যাবহারে হঠাথ এতটা পরিবর্তন শুধু রুপালিকেই নয়; ওদের ব্যাচের অনেককেই অবাক করে। আগের বছরগুলোতে অন্তত রেজাল্টের দিন পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিয়মিত খোঁজখবর নিত যে, সে হঠাথ করে এইভাবে নিজেকে আইসোলেট করে নিল কেন; সেটা বুঝতে পারে না রুপালি-পম্পাদের মত ব্যাচের অনেকেই।
সকালে মা’কে টয়লেট থেকে নিয়ে এসে বিছানায় শোয়ানোর পর ব্যালকনিতে বসে পেপারের হেডলাইনে চোখ বোলাচ্ছিল শতদীপ। আর এক সপ্তাহ পরেই এই আরামের জীবন শেষ, নতুন মরসুমের ব্যাচের ছেলেমেয়েদের কোচিং শুরু হয়ে যাবে। হঠাথ বাড়ীর ল্যান্ডলাইনে কল আসছে; কে জানে আবার নতুন কোনো স্টুডেন্টের বাড়ীর লোক মনে হয়; ব্যালকনি থেকে ফোনটা ধরতে ড্রয়িং রুমে আসে শতদীপ। হ্যাঁ; আননোন নাম্বারই বটে, কোনো গার্জিয়ানই হবে মনে করে ফোনটা রিসিভ করে শতদীপ, “হ্যালো! শত’দার কোচিং সেন্টার!”
ফোনের ও’পারে ১০ সেকেন্ড শ্মশানের নীরবতা; “কি হল কথা বলুন! কোন ক্লাসের জন্য কোয়্যারি করছেন? এই বছরের সব ব্যাচই পরের সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে।”
“অসভ্য ইতর কোথাকার! কি নির্লজ্জ লোক তুমি হ্যাঁ? এদিকে তোমার কথা ভেবে আমার স্নান খাওয়া মাথায় উঠেছে; আর তুমি নিশ্চিন্তে পরের বছরের কোচিং-এর বুকিং নিচ্ছ?”
“রুপালি, আমার অনেক কাজ আছে। এম. এস. সি. অবধিই আমি লাস্ট পড়াই; যেটা তোদের রেজাল্ট বেরোনোর পর মাস’দুয়েকের মধ্যেই কমপ্লিট হয়ে যাবে। রাখছি!”
শতদীপ ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল; কিন্তু ও’প্রান্তে রুপালি চিৎকার করা শুরু করে, “খবরদার বলছি! কথা না বলে ফোন রাখবে না! মোবাইলে ১০০ বার ফোন করলেও ফোন ধর না; কেন আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি, সেটা খোঁজ নিতে গেলে কি জাত যাবে তোমার?”
“ব্যাপারটা সেটা নয়। বিশ্বাস কর, তোর আর আমার রাস্তা কোনোদিন এক হতে পারবে না; প্রচুর সমস্যা হবে তাতে; তোর বাড়ীতেই! তাই আমার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করিস না; ভালো থাকিস!”
“কথাটা এমন ভাবে বলছো যেন আমাকে রিজেক্ট করে মিস ইন্ডিয়াকে ডেট করবে! এত ঔদ্ধত্য কোথা থেকে আসে শুনি?”
“কি আর বলবো! তুই যদি ওটা মনে করে খুশী হয়ে আমাকে ভুলে যেতে পারিস, তাহলে সেটাই....!!”
“কি সহজ না ব্যাপারগুলো তোমার কাছে! যত শুনছি ততই অবাক হচ্ছি। ঠিক আছে; ভুলে যাবো; কিন্তু প্লিজ, পুরোপুরি আলাদা হয়ে যাবার আগে একবার লাস্ট দেখা করতে চাই; অনুরোধটা রাখবে?”
“সরি; কথা দিতে পারছি না! এইসব বাদ দে প্লিজ!”
“আজ বিকেল ৪ টের সময় ১৭ নম্বর রেলগেটের পাশেই নূতন পল্লী স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠ! আমি অপেক্ষায় থাকবো!”
শতদীপ ঠিকই করে নিয়েছে যাবে না; কিন্তু “অপেক্ষায় থাকবো!” শব্দ ২ টো এত বিচ্ছিরি যে, মাঝের সময়টা ভীষণ অন্যমনস্ক কাটিয়ে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হাফিয়ে উঠে, শেষ পর্যন্ত বিকেলে ও গেল রুপালির সঙ্গে দেখা করতে।
মাঠের ধারে পৌঁছে সাইকেলটা লক করতে করতে হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকাল শতদীপ; দুপুর ৩ টে ৫৫ বাজছে। “ও শত’দা, এদিকে চলে আসো প্লিজ..!!”- মাঠের উল্টোদিক থেকে রুপালি ডাকছে ওকে।
“কখন এসছিস তুই? ৪-টের সময় ডাকলি তো?”; হাঁটতে হাঁটতে মাঠের পশ্চিম দিকে পৌঁছে শতদীপ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় রুপালির উদ্দেশ্যে।
“আমি ৩-টের সময়ই চলে এসেছিলাম। শেষ ২ সপ্তাহ ধরে মনে হচ্ছিল, আমার জীবনটাই বুঝি শেষ হয়ে গেল। আজ এখানে আসলে বাঁচার রসদ পেতে পারি; এই আশাতেই আর বাড়ীতে থাকতে না পেরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে এসেছি!”
“দেখ রুপালি, তুই যদি কারোর প্রতি প্রচুর এক্সপেকটেশন রাখিস, তাহলেই তার রেসপন্সের উপর বাঁচা-মরার ফিলিংগুলো নির্ভর করে। এক্সপেকটেশন না রাখলেই কেল্লা ফতে; কোনো নির্ভরতা নেই। আমি আসি, না আসি, ফোন ধরি, না ধরি; যা-ই করি না কেন, কোনো কিছুতেই তোর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে না। তো এইরকমভাবে ভাবা শুরু কর, ব্যাপারটা সহজ হবে!”
শতদীপের মনোভাব দেখে মনে মনে ভীষণ রাগ হচ্ছিল রুপালির; তবু ওর কথা শুনে যখন শতদীপ ওর সাথে দেখা করতে এসেছে, তার মানে মুখে এইভাবে কথা বললেও মন থেকে হয়তো আজও ওকেই ভালোবাসে; এসব ভাবতে ভাবতে শান্ত মনে রুপালি বলল, “ঠিক আছে শত’দা; আমি তোমার জায়গাটা বুঝেছি। বিশ্বাস করো, পরীক্ষার মাঝখানে বিয়ে নিয়ে ভাবতে বসলে আমার সত্যিই পড়াশোনা করতে অসুবিধা হয়; আমার কেন, দুনিয়ার সবারই হয়! আমি নিজেই বাবাকে ‘না এখন কোনোমতেই বিয়ে করব না’ বলতে পারতাম; কিন্তু বাবা শুনতো কিনা সন্দেহ আছে। যেহেতু তার কয়েকদিন আগেই অনেক কষ্টে আমার ব্যাপারে তোমার মনের কথাটা আমি কোনোমতে জানতে পেরেছিলাম, তাই আমি খানিকটা ভরসা করেই বাবাকে তোমার কাছে পাঠাই। আমি বুঝিনি তারজন্য তুমি এতটা রেগে যাবে! তুমি তো আগেও আমার কিংবা পম্পা বা তোমার অন্য আরও অনেক মেয়ে স্টুডেন্টদের বাড়ীর লোককে বুঝিয়ে বিয়ের ব্যাপারে নিমরাজি করিয়েছো; আমি সত্যি ভাবিনি আমি নিজে থেকে বাবাকে তোমার কাছে পাঠালাম বলে তুমি এতটা রেগে যাবে যে আমার সাথে সমস্ত রকম যোগাযোগই বন্ধ করে দেবে!”
“তখন ব্যাপারটা অন্য ছিল; সেইসব মেয়েরা আমার স্টুডেন্ট ছিল। আজ থেকে ২ মাস পর, ফেল না করলে তোদের ব্যাচের কেউই আর আমার স্টুডেন্ট থাকবে না; দে আর অন দেয়ার অউন! তো এখন যদি আমি আমার পুরনো স্টুডেন্টদেরও বিয়ে দেওয়া আটকে বেড়াই, তাহলে সব গার্জিয়ানই আমাকে নিজের চরকায় তেল দিতে বলবে; যেটা সেদিন অমলকাকুও বলে গেছেন! আমার কাজ পড়ানো, আমি সেটাতেই মন দিতে চাই।”
“আচ্ছা! তার মানে আমি তোমার কাছে জাস্ট এক্স-স্টুডেন্ট! বিশ্বাস করতে সত্যি কষ্ট হচ্ছে যে জাস্ট ৩ মাস আগেই ব্যাপারটা পুরোপুরি অন্যভাবে শুরু হয়েছিল; ইভেন হপ্তা ২ আগে লাস্ট এগসামের দিন পর্যন্তও জিনিষটা অন্যরকম ছিল! আমরা আবার লেভেল জিরো তে চলে এলাম; কেন যে কঠিন সময় শেষ হয়েও হচ্ছে না ভগবানই জানেন!”-কথাগুলো বলার সময় রুপালি চোখের জল আটকাতে পারে না।
রুপালিকে বুঝতে না দিলেও মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল শতদীপেরও; সেই জন্যই হয়তো রুপালির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছিলো না ও। শেষ ১০ বছরে মা ছাড়া বাকি সবার সামনেই ও নিজের অনুভূতিগুলোকে সবসময় দাবিয়ে এসেছে। সেই মেজাজটা ধরে রেখেই ও চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, “প্লিজ; আমার সামনে চোখের জল ফেলিস না; লাভ হবে না! আমারও মাঝেমধ্যে টায়ার্ড লাগে; সবসময় বাড়ীর লোকেদেরকে পড়াশোনার ভ্যালুটা বোঝাতে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, তারা তো তোদের মত মেয়েদেরকে জন্ম দিয়েছেন, তাই তোদের লাইফে কি হওয়া উচিৎ আর কি উচিৎ না, সেটা ঠিক করার রাইট আমার থেকে বেশী ওদের আছে! প্লিজ কথাটা অন্যভাবে নিস না! কাকু আগেরদিন যেভাবে প্রচণ্ড খুশীমনে এই ব্যাপারটা বলছিলো যে তোকে না জানিয়ে তোর ফোটো সুজয়কে পাঠিয়েছে তোকে পছন্দ করানোর জন্য; আমার সেটা বড্ড গায়ে লেগেছে। তোকে আমি জাস্ট স্টুডেন্ট ভাবি না অন্য কিছু; এটার বাইরে গিয়েও যদি দেখি, আমার ব্যাপারটা শ্রুতিকটু লেগেছে। আপনার মেয়ে কি আপনার কাছে পণ্য যে তাকে আপনি ফোটো দেখিয়ে পছন্দ করাচ্ছেন, এইভাবে তো আমরা অনলাইন শপিং পোর্টালে জিনিষপত্র পছন্দ করি! ডিসগাস্টিং!”
“ঠিক আছে; বাবার হয়ে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি; প্লিজ কিছু মনে কোরো না! তোমার এই ধরণের ফিলিংগুলোর জন্যই তো এত খারাপ লাগার পরও তোমাকে কিছুতেই ভুলতে পারি না! চল না আমরা আবার নতুন করে শুরু করি; তুমি আমাকে বিয়ে করে নাও প্লিজ! আমরা শ্যামনগর থেকে অনেক দূরে কোথাও গিয়ে নিজেদের জীবনটা নতুনভাবে সাজাই। জানি প্রথমে কয়েকদিন কষ্ট হবে; বিশ্বাস করো তুমি যেভাবে রাখবে আমি সেইভাবেই থাকবো; দরকার হলে এক কাপড়ে। আমি জানি আমরা একসাথে থাকলে সব প্রবলেমের সলিউশন হয়ে যাবে!”
“আর আমার মায়ের যে মাসে ছ’হাজার টাকার ওষুধ লাগে সেটার ব্যাবস্থা কিভাবে হবে সে ব্যাপারে কিছু ভেবেছিস? যখন প্রথম স্টুডেন্টদের বাড়ীতে গিয়ে প্রাইভেট টিউশন করানো শুরু করেছিলাম, সেই সময় মায়ের বয়স আর শরীরে কমপ্লিকেশনস; ২ টো-ই কম ছিল। লাস্ট ১০ বছর ধরে আমার মা শয্যাশায়ী; তার চিকিৎসা কিভাবে হবে সেটা ভেবেই আমি এম. এস. সি.-র পর পড়াশোনা ছেড়ে রোজগারের পথ ধরেছিলাম। আই ডিড ইট ফর আ কজ; নট বাই চয়েজ! তুই যেমন ইমম্যাচিওরের মত কথা বলছিস; হঠাত নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে পশার জমিয়ে এই লেভেল অবধি আসতেও তো বেশ খানিকটা সময় লাগে, সেই ক’দিন আমার মায়ের কি হবে ভাবলেই আমি শিউরে উঠি। জানি না অমলকাকু এইগুলো জানেন কি জানেন না; কিন্তু সেদিন আমি তোকে বোঝাতে রাজি হইনি বলেই আমার বিয়ে আর পড়াশোনা নিয়ে আমাকে যা শুনিয়ে গেছেন; কি আর বলব! সেই মানুষ যদি শোনেন তার মেয়ে আমার সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছে, তাহলে তো আর কথাই নেই। এতদিন টিচার হিসেবে যা সম্মান পেয়েছি, পুরোটাই জলাঞ্জলি দিতে হবে!”- একটানা কথাগুলো বলে থামলো শতদীপ।
রুপালি অনেকক্ষণ সংযম রেখে শতদীপের কথাগুলো শুনছিলো। ক্রমশ ওরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করে, “কাকিমার শরীর, তোমার ক্যারিয়ার, তোমার সম্মান; এমনকি যে তোমাকে এত কথা শুনিয়ে গেছে, সে; মানে আমার বাবা কি ভাববে সেটা নিয়েও তোমার চিন্তা আছে! আচ্ছা, এই দুনিয়ায় কি শুধু আমিই আছি, যার ব্যাপারে বা যে কি ভাবছে সেই ব্যাপারে তোমার ভাবতে ইচ্ছা করে না?”
“সেটা একেবারেই নয়। যেনে রাখ, এই দুনিয়ায় যদি মন থেকে সবচেয়ে বেশী কাউকে প্রফেশনালি সাকসেসফুল দেখতে চাই, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে তুই! আজ থেকে ৫ বছরের মধ্যে যদি তুই আই. আই. টি.-র প্রফেসর হিসেবে পরিচিতি পাস, তাহলে আমার থেকে বেশী খুশী কেউ হবে না। বুক চিতিয়ে কাকুকে গিয়ে বলব যে, দেখুন; এইজন্য বলতাম মন দিয়ে পড়াশোনা করতে দিন!”
এরপর রুপালি রাগে অন্ধ হয়ে বলে ওঠে, “শোনো তোমার এই জ্ঞানের কথা না আর হজম হচ্ছে না আমার! ভেবে এসেছিলাম যে যাই হোক, সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে ২ জনে মানিয়ে নেব! কিন্তু কোথায় কি! তুমি তো সমস্যাগুলোকে জিইয়ে রাখতে চাও। যখন তুমি আমার ফিলিংসকে রেসপেক্ট করছো না; তখন জেনে রাখো, আমিও তোমার কথামতো নিজের লাইফ লিড করতে বাধ্য নই। আমি সেটাই করবো যেটা আমার ঠিক বলে মনে হবে! জীবনে আর ফিরেও তোমার কথা ভাবব না; তোমার দিকে তাকানো তো দূর অস্ত! লাইফ আর ফোন; ২ জায়গা থেকেই আজ তোমাকে আমি ব্লক করলাম; সারাজীবনের জন্য! আমারই ভুল; যার প্রোপোজ করার দম নেই, আমি আশা করেছিলাম সে নাকি বিয়ের জন্য আমার বাড়ীতে কথা বলতে আসবে! ভাঁড় মে যাও...... ফাট্টু কোথাকার!!”- কথাগুলো বলার পর রাগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের সাইকেলটা নিয়ে মাঠ থেকে বিদায় নেয় রুপালি।
****
খুব কষ্ট করে হলেও ঘুমনোর চেষ্টা করছিলো রুপালি। বিয়ে হয়ে পুরোপুরি অচেনা একজনের বাড়ীতে গেলে ওর এই সাধের ঘুম আর কখনো নিজের ইচ্ছেমতো পুরো হবে কিনা, সেই চিন্তা মাথায় রেখে শেষ কয়েকদিন ধরে একটু বেশীই ঘুমনোর চেষ্টা করছিল ও। তবু, বিয়ের আসর বসতে তো এখনো ২ দিন বাকি; তার মধ্যেই ওদের বাড়ী আত্মীয়দের ভিড়ে এত ভরে গিয়েছে যে, শেষ ১ সপ্তাহ ধরে নিজের বাড়ীটাকে ছোটোখাটো একটা পাড়া মনে হচ্ছে রুপালির। কারোর বিয়ে হলে সমস্ত আত্মীয়রা এসে ভিড় করে বাড়ীতে, আবার বিয়ে হয়ে গেলেই তারা সমাজে মিলিয়ে যায়; নিজেদের জায়গায়। এদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই অন্য সময়ে হয়তো নিয়মিত যোগাযোগও রাখে না! এমন অনেক আত্মীয় আছেন যাঁদেরকে হয়তো খুব ছোটবেলায় দেখেছিলো রুপালি; আবার বিয়ের সময় দেখবে। একজন মানুষের দুঃখের দিনে; বিশেষত কনের বাড়ীতে; এত লোক জড় হয়ে আনন্দ করে, কি খুশী যে অর্জন করার চেষ্টা করে; অনেক ভেবেও সেটা বুঝতে পারে না রুপালি।
অনেকক্ষণ বালিশে এপাশ-ওপাশ হয়ে শুয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করছিলো রুপালি। কিন্তু নিচে, মেঝেতে বিছানা করে শুয়ে ওর মায়ের কাকাশ্বাশুড়ী ফোনে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্রমাগত তাঁর ৩ মাসের নাতনির কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষ আধ ঘণ্টা ধরে এই ব্যাপারটা চলছিলো; আর ঘুমোতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছিলো রুপালি। শেষ পর্যন্ত ঘুমনোর আশা ছেড়ে ফোনটা হাতে নেয় ও; সবে সকাল পৌনে ৬ টা বাজছে। বরাবরই রাত জাগাটাকে ভোরে ওঠার থেকে বেশী অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে রুপালি। আজ প্রথমবার এত ভোরে বিছানা ছেড়ে উঠে বাড়ীর ছাদে আসে ও। ভোরের লাল সূর্য পূর্বদিকে উঠছে; প্রথমবার এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পেয়ে প্রথমে খানিকটা খুশী হলেও; কিছুক্ষণ পরই মন ভার হয়ে আসে রুপালির। আর ২ দিন পরই বিয়ে, তার ১ সপ্তাহের মধ্যে অষ্টমঙ্গলা হয়ে গেলে পরে সুজয়ের পিছু পিছু পাড়ি দিতে হবে বাগানের শহর; ব্যাঙ্গালোরে! এই মফঃস্বলের বাড়ীর তিনদিক খোলা ছাদ, কালবৈশাখীর প্রথম বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধ, সাইকেল নিয়ে শীতের দুপুরে বান্ধবীদের সাথে এপাড়া-ওপাড়াতে ঘোরা, পরীক্ষার আগে গ্রুপ স্টাডির নামে বাড়ীতে মিথ্যে বলে পম্পার সাথে সিনেমা দেখতে যাওয়া, এম. এস. সি-তে ফাইনালে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার পর ওদের পাড়াতে হওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠান- এই সব কিছুই অতীত হয়ে যাবে ওর জীবন থেকে! সত্যি; যদি এইরকম কোনো অলিখিত নিয়ম থাকতো যে, কোনো মেয়ে যেখানে মানুষ হয়েছে; কখনো তার বিয়ে হলে সেই জায়গা বা তার আশপাশের কোনো ছেলের সাথেই হবে; তাহলে কত ভালোই না হত! অন্তত যে জায়গাটার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকে ও নিজের জীবনের তেইশটা বছর কাটিয়েছে, সেই জায়গাটাকে মিস করবে বলে এতটা খারাপ লাগতো না- এইসব চিন্তা করতে করতে নিজের খেয়ালে থাকা ভাবনার দুনিয়ায় ডুব দেয় রুপালি!
“কি রে! অন্তত ৫ বার ডাক দিলাম নিচ থেকে। কোন স্বপ্নের দুনিয়াতে রয়েছিস বল তো? এমনিই বাড়ীতে হাজারটা কাজ; তার মধ্যে তুই এইভাবে নিজের খেয়ালে থাকলে আমার কি অবস্থা হবে একবার ভেবেছিস?”- হঠাথ মায়ের চিৎকারে সম্বিৎ ফেরে ওর।
“সরি মা! আর তো ২ টো দিন। তারপর এই বাড়ীতে সবসময় থাকা আমার কাছে পাস্ট টেন্স হয়ে যাবে! ওইসব চিন্তাই মাথায় চলতে থাকে আর কি! বল, কি বলছো?”
“ও বাবা! এত ভাবিস না! আমি যেটা বলতে এসেছিলাম যে, শেষ ৪-৫ দিন ধরে তো রীতিমত মাথা খেয়ে নিচ্ছিলি যে দেখ, আর ক’দিন পরেই বিয়ে করে চলে যাবো; আর কোনো বন্ধু এইসময় পাশে থাকছে না! আর আজ সকাল সকাল পম্পা তোর সাথে দেখা করতে এসেছে আর তুই কিনা নিজের খেয়ালে ডুবে রয়েছিস! এখন তাড়াতাড়ি নিচে যা; দেখা কর! আর হ্যাঁ, একটা কথা সবসময় মনে রাখবি; ভালোবাসার সম্পর্কের বাঁধন দূরে গেলে বেশী শক্ত হয়! সেটা তোর আর আমাদের ক্ষেত্রেও খাটবে; মিলিয়ে দেখে নিস।”
মায়ের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে পম্পার সাথে দেখা করার জন্য নিচে আসে রুপালি। “৫-৬ দিন ধরে কন্টিনিউয়াসলি কল করছি; আর তোর কি না আজ আসার সময় হলো?”
“হ্যাঁ! ওই আর কি! সব ঠিকঠাক চলছে তো?”- পম্পার কথা বলার ধরণে খানিকটা জড়তা লক্ষ্য করে রুপালি; আগে কখনো পম্পাকে এভাবে কথা বলতে শোনেনি ও।
“কি হয়েছে বল; সব ঠিকঠাক তো?”
“যদি কিছু মনে না করিস, তাহলে আমরা কি কোনো ঘরে গিয়ে কথা বলতে পারি?”
“বাবা! হঠাথ এত ফর্মাল হয়ে গেলি কেন বল তো? চল যাই! কিন্তু ১ মিনিট, ঘর তো সেভাবে কোনটাই ফাঁকা নেই, সব ঘরেই কেউ না কেউ রয়েছে। ছাদে বসলে অসুবিধা নেই তো?”
“না না! কোনো ব্যাপার না।”
“আচ্ছা! ছাদে চল তাহলে!”- রুপালি কথাটা বলার পর ও আর পম্পা ক্যাটারিং-এর দেওয়া ২ টো চেয়ার নিয়ে ছাদে এসে বসে।
“হ্যাঁ, এবার বল তো ব্যাপারটা কি! তোর বাড়ীতে সব ঠিকঠাক তো? কাকু-কাকিমা, দাদা সবাই ভালো তো?”-রুপালি কথাটা জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে টেনশনের চোরাশ্রোত বইতে থাকে ওর মনে।
বেশ গম্ভীর মুখে পম্পা বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ! বাড়ীতে সব ভালো। বলছিলাম কি, যতদূর মনে পড়ছে; আজ অবধি তোর ফ্রেন্ড হিসেবে তোর থেকে সেভাবে কোনো ফেভার চাইনি। আজ একটা দাবি রাখবো; প্রমিস কর প্লিজ যে আমার কথা রাখবি!”
রুপালি সঙ্গে সঙ্গে পম্পার কপালে হাত রাখে। “জ্বর তো নেই। আমায় চিনতে পারছিস মানে তোর মাথাও খারাপ হয়নি! আর যতদূর মনে পড়ছে, লাস্ট এগসামের দিনও মাল্টিপল চয়েসের ৩ টে কোয়েশ্চেন তুই আমার সঙ্গে ডিসকাস করে অ্যানসার করেছিলি; মানে ফেভার তো ভরপুর নিয়েছিস! তাহলে হঠাথ এইরকম গোমড়ামুখ করে এইসব কথা বলছিস কেন?”
“প্লিজ রুপালি! ইটস আ বিট সিরিয়াস!”
“আচ্ছা সরি রে! আমি ইয়ারকি করছিলাম। বল; কি হয়েছে? আমার লিমিটে যতটুকু পসিবল, আমি ডেফিনিটলি হেল্প করার চেষ্টা করবো!”
“একটু শত’দা কেমন আছে দেখতে যেতে চাইছিলাম। তুই সঙ্গে গেলে বড্ড ভালো হত..!!”- আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল পম্পা কিন্তু রুপালি তার মাঝেই ওকে থামিয়ে দেয়।
“এবার সত্যি সত্যি আমার সন্দেহ হচ্ছে তোর শরীর ঠিক আছে কি না! একদম সিরিয়াসলি বলছি..!! ওই ফাট্টু লোকটা আমার জীবনটাকে কিভাবে শেষ করে দিয়েছে; তোকে তো আমি তার পুরোটাই জানিয়েছিলাম! খুব কষ্ট করে ওকে ভুলে থেকে আমি আমার জীবনের একটা নতুন চ্যাপ্টারে ঢোকার চেষ্টা করছি আর তুই কি না আবার ওর মেমোরিগুলোকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিস! সরি বস, অন্য কাউকে দেখে নে বা একা চলে যা; আমার থেকে কোনো এক্সপেকটেশন রাখিস না!”
রুপালির কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে পম্পা চেয়ার থেকে উঠতে শুরু করে, “হুম; আমার মনেই হয়েছিলো এইধরণেরই কিছু রিপ্লাই দিবি তুই! ঠিক আছে চল, আমি দাদাকে জানাচ্ছি দেখি! তোর পার্সোনাল গ্রাজ কিছু থাকতেই পারে; অ্যাজ পার ইয়োর পাস্ট এক্সপেরিয়েন্স….. কিন্তু আমাদের তো চিন্তা হচ্ছে! দেখছি কি করা যায়! চল এখন আসছি আমি; কাল দুপুরের দিকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে তোর বাড়ীতে চলে আসবো বিয়ের ক’দিনের জন্য; ঠিক আছে!”
পম্পা উঠে চলে যেতে যাচ্ছিলো; তখনই রুপালি চেপে ধরে ওর হাতটা। “কি হয়েছে বল তো; তোদের তো চিন্তা হবেই...... মানেটা কি? ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবি প্লিজ?”
রুপালির কথামতো পম্পা ওর চেয়ারটা আর ১ বার টেনে নিয়ে রুপালির সামনে এসে বসে বলতে শুরু করে, “তুই তো জানিসই লাস্ট যখন বি. এস. সি.-র পর; আমার বাবাকে বুঝিয়ে শত’দা আমার বিয়ে না দিয়ে আমাকে এম. এস. সি. পড়ানোর জন্য জোর করেছিল, তখন থেকেই শত’দার সঙ্গে আমার দাদার গলায় গলায় বন্ধুত্ব। তো শত’দা লাস্ট উইকের আগের উইক অবধিও আমার দাদার বাইকে করে ঘুরে বেড়িয়েছে; সেই সব জায়গায় যেখান থেকে তোর বিয়ের সমস্ত আয়োজন হচ্ছে! এখন দরকার নেই; কিন্তু বিয়ের পর কখনো কাকুকে জিজ্ঞেস করে দেখিস; ক্যাটারার, ট্রান্সপোর্ট, বিয়েবাড়ি ভাড়া, ফুলের ডিলার, এমনকি ক্যামেরাম্যান পর্যন্ত...... প্রত্যেকে অমলকাকু কথা বলতে গেলে যে ফাইনাল রেট দিয়েছিলো, পরে শত’দা গিয়ে কথা বলাতে অলমোস্ট সবাই-ই কাকুকে পারসোনালি ফোন করে ডিসকাউন্ট দিয়েছে। আর এই সবটাই হয়েছে আমার দাদার সামনে; কারণ এই প্রত্যেকটা জায়গাতেই যখন শত’দা কথা বলতে গিয়েছিলো, দাদা ওর সঙ্গে ছিলো। দাদা আমাকে বলছিলো, প্রত্যেকটা জায়গাতে শত’দা যেই না রিকোয়েস্ট করছে রেটটা একটু রিভাইস করার জন্য, সাথে সাথে ওইদিক থেকে রিপ্লাই এসছে, ‘ঠিক আছে মাস্টার; তুমি বলছো যখন এই অর্ডারটা কমে করে দেবো!’ দাদা তো শত’দা কে এইটাও জিজ্ঞেস করেছে যে, ‘আজ অবধি তো তোকে স্টুডেন্টদের বিয়ে আটকাতে দেখেছি; প্রথমবার দেখছি কোনো স্টুডেন্টের বিয়ে যাতে ঠিকঠাক ভাবে হয়ে যায় সেটা নিয়ে ওদের ফ্যামিলির থেকে তোর বেশী চিন্তা; কেন বল দেখি?’ সেই সময় শত’দা আমার দাদাকে উত্তর দেওয়া থেকে এড়িয়ে গেলেও হপ্তাদুয়েক আগে দাদা আসল কারণটা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছে....!! গেল সোমবারের আগের সোমবার তুই যখন সকালবেলা পার্লার থেকে ফিরছিলি, তখন তোদের গলির সামনে নবান্ন হোটেলে আমার দাদার সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিলো শত’দা। দাদা বলছিলো, শত’দা নাকি তোর দিকে এমন গোলগোল চোখ করে তাকিয়েছিল যেন তোকে প্রথমবার দেখছে!”
সকালে আসার পর প্রথমবার পম্পার কথা বলার ভঙ্গিমাতে কিছুটা হলেও জড়তা কম লক্ষ্য করছিলো রুপালি; হয়তো সেইজন্যই পম্পার কথা শুনতে শুনতে প্রায় সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলো ও। কিছুক্ষণ থামার পর পম্পা ফের বলা শুরু করে, “দাদা তো ইভেন আমাকে এটাও বলেছে যে, যদি আমি শত’দা কে রাখি না পরাতাম, তাহলে হয়তো আমার পড়াশোনা শেষ হলে বাড়ীতে আমার সঙ্গে শত’দার বিয়ে দেওয়া নিয়েও আলোচনা করতো। বাড়ীতে আমি এই ঘটনাটা কোনোদিন জানাইনি যে, শত’দা কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়া আমার থেকে রাখি পরে নিলেও তুই যে কোনোদিন রাখি পরাসনি, সেটা ভেবে মনে মনে খুব খুশী হতো! ইভেন এই ব্যাপারটাও জানাইনি যে, মাস চারেক আগের সেই রাতে যখন তোর পাগলামো করার খুব শখ হয়েছিলো, আর তোর প্ল্যান জানা সত্ত্বেও অত রাত অবধি তোর কোনো খোঁজ নিইনি বলে; শত’দা আমাকে যেভাবে বকা দিয়েছিলো, কোনোদিন খারাপ মার্কশীট নিয়ে সামনে দাঁড়ালেও দেয়নি!”
বেশ অনেকক্ষণ ধরে পম্পার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলো রুপালি। পম্পা চুপ হওয়ার পর ও বলে ওঠে, “তো! আর ২ দিন পর সুজয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে; এখন এই কথাগুলো শুনে আমার কোনো লাভ আছে? এই ব্যাপারটাই তো আমার সবচেয়ে বেশী অদ্ভুত লাগে যে; কারোর যদি আমাকে নিয়ে কোনো ফিলিং থাকে; তাহলে সে তার কিছুটা তো আমাকে শো করবে, রাইট? আমাকে খুঁজে না পেয়ে তোকে বকা দিয়েছে; আমার বাবার বিয়ে দিতে যাতে অসুবিধা না হয় তার জন্য গাড়ীওয়ালা, ফুলওয়ালা, প্যান্ডেলওয়ালার সাথে কথা বলেছে.... সব বুঝলাম! কিন্তু সে আমার জন্য; আমরা যাতে একসাথে থাকতে পারি তার জন্য; কি করেছে?”
রুপালির কথা শুনে পম্পা মাথায় হাত দেয়। বলে ওঠে, “সত্যি কথা বলতে কি; মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, শুধু তুই কেন, তোর বা আমার মত কেউই শত’দা’র সঙ্গে একছাদের তলায় থাকার যোগ্য নই! মানুষটা সবসময় নিজের আগে স্টুডেন্টদের, নিজের মায়ের, ইনফ্যাক্ট ১ সপ্তাহ আগে পর্যন্ত তোর আর তোর ফ্যামিলির কথা ভেবে এসছে; এখন ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে সে নিজের ভালোলাগার ব্যাপারে; নিজের খুশীর ব্যাপারে ভাবতেই ভুলে গেছে! ভেবে দ্যাখ, কাকু যেভাবে বিয়ে আর পড়াশোনা নিয়ে কথা শুনিয়ে এসেছিলো শত’দা’কে, ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে তোর বিয়ে ঠিক করে হয়ে যাবার ব্যাপারে একবারও ভাবতো? তুই-ই তো বলেছিলি, প্রথমবার তুই প্রোপোজ করার পর তোকে ভালোবাসে না; ইভেন এই মিথ্যে কথাটাও তোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারেনি.... নেহাৎ সেদিন রাতে তুই রেস্টুরেন্টে পাশে বসিয়ে জোর করে জিজ্ঞাসা করেছিলি বলে আসল সত্যিটা মন থেকে স্বীকার করেছিলো! আমিও মাথামোটা; যখন মাসখানেক আগে তুই বললি যে আর পোষাচ্ছিল না এই সাইকো ফাট্টুর সঙ্গে থাকা; ব্রেক-আপ করে নিয়েছিস.... তখনও মাথায় আসেনি তোকে জিজ্ঞেস করার কথা যে, শত’দা কি একবারও সেদিন তোর চোখের দিকে তাকিয়ে তোকে পছন্দ করে না; এই কথাটা বলেছিলো? সে তোর কাছ থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নিতে চাইছিলো, তার মধ্যে তুই পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলে হয়তো তোর পছন্দের কথা কাকুকে মানতেই হত এই আশায়! হি লাভস ইউ বেয়ন্ড এনি এক্সপেকটেশন ফ্রম ইয়োর এন্ড; সেইজন্যই তোর অন্য কারোর সাথে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এটা জানার পরও তোর বিয়েতে আড়ালে থেকে হেল্প করছে! এইরকম মানুষ আদৌ আজকালকার দিনে পৃথিবীতে আর একটা এক্সিস্ট করে কি না সন্দেহ আছে!”
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ফের বলতে শুরু করে পম্পা, “আমাকেও দাদা গতকাল রাত্রে এসে যদি এই তোর বিয়ের জন্য ঘুরে বেড়ানোর গল্পগুলো না করতো, তাহলে হয়তো ব্যাপারগুলো আমার মাথাতেও আসতো না! কিন্তু; একটা কথা বল, তুই তো একটা সময় পর্যন্ত শত’দা’কে মন থেকে ভালবেসেছিলি; আমার ভাবতে অবাক লাগছে যে তোর মাথাতেও কি সত্যি এই ব্যাপারগুলো একবারও আসেনি! কাকিমা; মানে শত’দা’র মায়ের তো অনেকদিন ধরেই প্রেশার আর হার্টের সমস্যা ছিলই.... হপ্তাখানেক আগে হঠাথ ঘুমের মধ্যে কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া হয়; আর উনি ঘুমের মধ্যেই মারা যান! পরেরদিন দাদারা সবাই শ্মশানেও গিয়েছিলো কাকিমার ক্রিমেশনের জন্য। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, এর ঠিক পরেরদিন, মানে লাস্ট রোববার থেকেই শত’দা নিজেকে ঘরে বন্দি করে নিয়েছে.... ইনফ্যাক্ট দাদাদের কারোর ফোন পর্যন্ত ধরছে না! কোচিং-ও বন্ধ করে দিয়েছে পুরোপুরি! আজকে ১ সপ্তাহ হয়ে গেল; তাইজন্য দাদার খুব চিন্তা হচ্ছিলো বলে গতকাল রাত্রে আমাকে এসে বলল একবার খোঁজ নিয়ে দেখতে! আমার একা যেতে একটু চাপ লাগছিলো বলে তোকে বলছিলাম একবার সঙ্গে যাবার জন্য! তোকে শত’দা’র সামনে যেতে হবে না, বাইরেই দাঁড়াস। অসুবিধা হলে আমি ফোন করলে তবে ভিতরে আসিস!”
কথা বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে ছাদের কোণায় চলে গিয়েছিলো পম্পা। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পরও রুপালি কথা বলছে না দেখে পিছন ফিরে তাকায়; রুপালি গলা দিয়ে একটুও আওয়াজ না করলেও অঝোরে কাঁদছে! “আরে আরে তুই কাঁদছিস কেন রে বাবা? সরি সরি! বিয়ের ২ দিন আগে তোকে এসব জানালাম; এক্সট্রিমলি সরি! ঠিক আছে বাদ দে.... আমি দেখছি!”
কোনওরকমে চোখ মুছতে মুছতে কাঁদো কাঁদো গলায় রুপালি বলল, “না রে! জানিয়ে একদম ঠিক কাজ করেছিস! যার ভালোবাসা এই ধরণের, তার কাঁদাই উচিৎ; তাতে যদি কোনো প্রায়শ্চিত্ত হয়! যদি সত্যিকারের ভালবাসতে পারতাম, তাহলে ওর মতো ইন্ট্রোভার্ট মানুষকে কাকিমা চলে যাবার পর আমিই দায়িত্ব নিয়ে সামলাতাম! স্বার্থপরের মত ভালবেসেছি বলেই হয়তো আজ ও নিজের দুনিয়াতে একা আর কোণঠাসা হয়ে গেছে আর আমি আমার দুনিয়ায় বিয়ের সেলিব্রেশনে মত্ত!!”- কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় রীতিমত ভেঙে পড়ে রুপালি।
অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ মুছতে মুছতে নিজেকে সামলে নেয় ও। পম্পার দিকে তাকিয়ে বলে, “শোন, আমি মুখের এই ছিরি নিয়ে মায়ের কাছে গেলে মা বুঝে যাবে নির্ঘাত কিছু ভুলভাল বলেছিস তুই আমাকে....তার চেয়ে বরং ৫ মিনিট বস; আমি একটু নর্মাল মুখ নিয়ে যাব মায়ের কাছে। আর হ্যাঁ, আমি সাইকেল নিয়ে বেরোব না, তাহলে বাবা-মা আবার সন্দেহ করতে পারে। তুই প্লিজ আজকের দিনটা একটু কষ্ট করে ডাবল ক্যারি করে নিস আমায়! আর হ্যাঁ; শত’দা’র সঙ্গে কথা বলতে তুই না, আমিই যাবো; তুই বাইরে দাঁড়াস! অনেক অন্যায় করেছি লোকটার সাথে, যতটা সম্ভব প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করবো আজ!”
****
ঘড়িতে বাজছে সকাল আটটা। সকালের ওঠা রোদ কোথায় যেন মুখ লুকিয়েছে; আকাশের মুখ ভার। ঝেঁপে বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। এর মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে বাজারে কিছু মেকআপের জিনিষ কিনতে যাচ্ছে; বাড়ীতে এটা জানিয়ে পম্পার সঙ্গে ওর সাইকেল নিয়ে পম্পা আর রুপালি ২ জনে রওনা দেয় শতদীপের বাড়ীর দিকে। ১০ মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করে ২ জন; শতদীপের বাড়ীতে বাইরে থেকে তালা মারা।
ইতিমধ্যে মুষলধারে না হলেও; বেশ জোরে বৃষ্টি হওয়া শুরু করেছে। বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচতে শতদীপদের বাড়ীর দরজার সামনের সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ায় ওরা ২ জন। পম্পা বলে ওঠে, “এ বাবা! বাইরে থেকে তালা মারা মানে তো শত’দা কোথাও বেরিয়েছে, রাইট? কিন্তু এত সকাল সকাল কোথায় যেতে পারে.... যদি আমার দাদার সঙ্গে বেরোতো, তাহলে দাদা নিশ্চয়ই আমাকে ফোন করে বলতো! কে জানে কি হল ব্যাপারটা!”
“দাঁড়া সামনের ‘শিল্পী স্টোরসের’ কাকুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখি একবার! ওনার দোকান তো রাস্তার ওপারেই.... যদি বাই চান্স দেখতে পেয়ে থাকেন যে ও কোথায় গেছে!”- কথাটা বলার পর রুপালি ওড়না মাথায় দেয়; রাস্তা পার হবার সময় বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে।
রুপালিকে রাস্তায় নামতে দেখে পম্পা বলল, “আরে আরে দাঁড়া! খুব জোর বৃষ্টি পড়ছে; ছাতাটাও আনিনি। হঠাথ এত জোরে বৃষ্টি নামবে যে বোঝাও যায় না ছাই!”
“দাঁড়াবার সময় নেই! তুই এখানে ওয়েট কর, আমি জিজ্ঞেস করে আসছি!”- পম্পাকে কথাটা বলার পর রুপালি রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের দোকানে পৌঁছায়।
“কাকু!! একবার এদিকে শুনবেন প্লিজ! একটু দরকার ছিলো!”- ‘শিল্পী স্টোরসে’ পৌঁছে দোকানদারকে ডাকে রুপালি।
দোকানের মালিক উত্তর দেন, “হ্যাঁ মা! কি লাগবে বলো!”
“না না কিছু লাগবে না সেরকম! আমি আর আমার বন্ধু শত’দা’র সাথে দেখা করতে এসছিলাম; দেখলাম বাড়ীতে বাইরে থেকে তালা মারা! আপনি যতক্ষণ দোকান খুলেছেন, তার মধ্যে কি ওকে বেরোতে দেখেছেন?”
“তোমরা পড়তে আসতে না ওর কাছে?”
“হ্যাঁ আমরা এক্স-স্টুডেন্ট! আসলে কাকিমা মারা যাবার পর থেকে কেউ ওর খোঁজ পাচ্ছে না, ফোন ধরাও বন্ধ করে দিয়েছে, তো সেইজন্যই জানতে এসেছিলাম আর কি!”
“হুম বুঝেছি! আসলে আমার মনে হয় ওর মা হঠাথ মারা যাবার পর থেকে ছেলেটা একটু কিরকম যেন হয়ে গিয়েছিলো! শেষ ১ সপ্তাহ ধরে তো দেখছি; সারাদিনে মাঝেমধ্যেই ওর বাড়ীর উপরতলা থেকে চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ পেতাম। গত পরশুদিন রাত্রিবেলা আমার স্ত্রী খাবার নিয়ে ওর বাড়ীর দরজায় গিয়েছিল; গত কয়েকদিন ধরে যেরকম চিৎকার শুনতে পেতাম আমাদের সত্যিই সন্দেহ হত যে ও আদৌ খাওয়াদাওয়া করছে কি না! তো দরজা ধাক্কা দেওয়ায় ও দরজা খোলাতে ওর অবস্থা দেখে আমার স্ত্রী রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলো! সেই ২ সপ্তাহ আগের শ্মশানে পরে যাওয়া সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিই পরে ছিলো; মাথার চুল, গালভরতি দাড়ি আর জামাকাপড়ের অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল শেষ ২ সপ্তাহে মনে হয় ঠিক করে স্নানও করেনি। যদিও আমাদের সাথে কোনো খারাপ ব্যাবহার করেনি; বরাবরের মত খুব শান্ত ভাবে খাবারটা না নিয়ে আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলো! আসলে কি জানো তো, কেউই তো অমর নয়; সবাইকেই একদিন না একদিন যেতে হবে। অনেকে এটা বুঝতে পারে; আবার অনেকে পারে না! যতদূর আমি জানি, শেষ ১০ বছর ধরে ওর দুনিয়াই ছিলো ওর মা; সবকিছু মায়ের কথা ভেবেই করে এসছে.... হয়তো সেইজন্যই মায়ের মৃত্যুটাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। যাই হোক, আজ সকালে তোমরা এখানে আসার মিনিট ১৫ আগেই ওকে দেখলাম বাড়ীতে তালা মেরে বেরোতে, সেই শ্মশানের পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে নোংরা অবস্থাতেই...... যতদূর মনে হল হেঁটেই বেরলো! নিজের খেয়ালে ছিলো বলে আমিও আর ডেকে জিজ্ঞেস করিনি যে কোথায় যাচ্ছে!”- একটানা কথাগুলো বলার পর থামলো দোকানদার।
কোনওরকমে চোখের জল আটকে দোকানদারকে থ্যাংকস বলার পর মোবাইল থেকে শতদীপের ফোন নম্বর আনব্লক করে সঙ্গে সঙ্গে ফোন লাগায় রুপালি। যা হবার তাই হয়; ফোন অনেকক্ষণ ধরে বাজলেও ওদিকে ফোন ধরে না শতদীপ। হতাশ হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই রাস্তা পেরিয়ে দোকান থেকে শতদীপের বাড়ীর দিকে আসা শুরু করে রুপালি। হঠাথ ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আসার রিংটোন শুনে ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না ও। ফোনের স্ক্রিনে হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশনে লেখা- ওয়ান আনরেড মেসেজ; ফ্রম শত’দা।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়েই হোয়াটসঅ্যাপ খুলে শতদীপের মেসেজ পড়া শুরু করে রুপালি। ততক্ষণে পম্পা শেডের তলায় শতদীপের বাড়ীর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা শুরু করেছে, “আরে কি মেয়ে রে বাবা! এভাবে কেউ বৃষ্টিতে ভেজে নাকি? এইখানে এসে ফোন দেখ; রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে এইরকম কে করে!”
রুপালি ওইসব শুনতেও পায় না; ও শতদীপের মেসেজ পড়ায় মনোযোগ দেয়। শতদীপের গলা শুনতে না পেলেও অনেকদিন পর ওকে মন থেকে অনুভব করতে পারবে ভেবে মেসেজটা খোলে ও। শতদীপ লিখেছে, “আমার মনেই হয়েছিলো আমি যতই এই দুনিয়ার থেকে আড়ালে চলে যাবার চেষ্টা করি না কেন, আমার ব্যাপারে জানতে পারলে তুই ঠিক আমাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করবি! একটাই কথা বলার আছে; আমাদের মধ্যে যা হয়েছে, তার জন্য প্লিজ সবসময় নিজেকে দোষারোপ করিস না! তুই আমাকে কিভাবে ভালবাসতিস, সেটা আমি কোনোদিন বোঝার চেষ্টাই করিনি। সবসময় তোর ইমোশনগুলোকে আমার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে না বুঝে; তোর বয়স অনুযায়ী ভাবলে হয়তো তোকে আমি আরও বেটার বুঝতে পারতাম। বেঁচে থাকতে মা অনেকবার করে বলতো; তোর বছরের পর বছর দেওয়া গিফটগুলোকে একবার হলেও খুলে দেখতে! নিজের ইমোশনকে দাবিয়ে রাখার জন্য কোনোদিন মায়ের কথা শুনিনি; শুনলে হয়তো আজকে মায়ের পরও কাউকে সময় কাটানোর জন্য পাশে পেতাম। শেষ কয়েকদিন বাড়ীতে থেকে দম আটকে আসছিলো; শেষ ৩ বছরে দেওয়া তোর প্রত্যেকটা গিফটপ্যাক আমি খুলে দেখেছি। আমি ঘড়ি পড়তে ভালোবাসি; সেটা প্রায় ৭ বছর আগে প্রথমবার তোর সাথে এসপ্ল্যানেডে গিয়ে ঘড়ি কেনার সময় বলেছিলাম...... সেটা মনে রেখে দিয়ে তুই এতগুলো সুন্দর ঘড়ি গিফট করেছিস; কোনটা ছেড়ে কোনটা পরব বুঝতেই পারছিলাম না। আমাদের পিকনিকে গিয়ে একসাথে বোটিং করা, একসাথে প্রথমবার দুর্গাপূজোর অঞ্জলি দেওয়া, তোর জন্মদিনের আগে একসাথে শপিং করতে যাওয়া...... সব স্মৃতিগুলোকে একসূত্রে বেধে এবার বিজয়ার পর এতসুন্দর কোলাজ বানিয়ে পাঠিয়েছিলি; বিশ্বাস কর, তখন খুলে দেখলে হয়তো আমি ডাইরেক্টলি তোর কাছে খানিকটা সময় চেয়ে নিতাম; যাতে ২ জনে একসাথে থাকতে পারি তার জন্য; এইসব পি. এইচ. ডি.-র বাহানা বানাতাম না। তোর ভালোবাসাকে রেসিপ্রোকেট করতে আমি কোনোদিন কিছুই করিনি; তোর বিয়ে ঠিকভাবে হয়ে যাবার জন্য তোর বাবার হেল্প করা দিয়ে তোর ভালোবাসাকে আমি রেসিপ্রোকেট করতে পারবো না; সেটা আমি গিফটপ্যাকগুলো খোলার পর ওইগুলো তৈরী করতে তোর যত্ন আর স্নেহ দেখে বুঝতে পেরেছি! তাই আমার মনে হয়, আমি তোকে, তোর ভালোবাসাকে কোনোদিন ডিসারভ করতাম না; এখনো করি না। তোর থেকে অনেক দূরে চলে গিয়ে তোকে শান্তিতে থাকতে দেখলেই আমি খুশী থাকবো। খুব ভালো থাকিস!!”
শতদীপের মেসেজ পড়ার পর গলায় আড়ষ্টতা চলে আসে রুপালির। ফের শতদীপকে ফোন করার চেষ্টা করে ও; এইবার শতদীপের ফোন সুইচড অফ আসে। ইতিমধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়া শুরু হয়েছে; আকাশ কালো করে ডাকছে মেঘ; তার সঙ্গে বজ্রপাত। রুপালি সিঁড়ির কাছে এসে পম্পাকে বলে, “চল! স্টেশনের কাছে; ১৭ নম্বর রেলগেটের দিকে যাই……”
আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিলো রুপালি কিন্তু পম্পা ওকে থামিয়ে বলে ওঠে-“তুই কি সত্যিই পাগল-টাগল হয়ে গেছিস নাকি? এইরকম বৃষ্টিতে বেশীক্ষণ ভিজলে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে! কিছুক্ষণ ওয়েট কর; বৃষ্টিটা একটু থামুক; তারপর যাচ্ছি। আমরা তো আমাদের এন্ড থেকে ম্যাক্সিমাম চেষ্টা করছি, রাইট? আর ২ দিন পর তোর বিয়ে.... এখন শরীর খারাপ করলে চাপ হয়ে যাবে!”
“ঠিক আছে; বৃষ্টি কমলে তুই ১৭ নম্বর রেলগেটের কাছে চলে আসিস; আমাকে দেখতে না পেলে স্টেশনে চলে আসিস। আর আমার ফোন খোলা থাকবে; অসুবিধা হলে কল করে নিস। এবার সাইকেলের চাবিটা দে, আপাতত আমি একাই যাচ্ছি। টু হেল উইথ বিয়ে!!”- পম্পা অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করলেও রুপালি এই কথাগুলো বলে ওর কাছ থেকে সাইকেলের চাবি নিয়ে ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই সাইকেল নিয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
ঝড়বৃষ্টির চোটে রাস্তা পুরোপুরি শুনশান থাকায় ১০ মিনিটের মধ্যেই ১৭ নম্বর রেলগেটের কাছে পৌঁছে যায় রুপালি। অনেকক্ষণ রেললাইনের ২ পারে শত’দা’কে খোঁজার চেষ্টা করলেও খুঁজে পায় না ও, শেষ পর্যন্ত মনে খুব একটা আশা না নিয়েই আমন্ত্রণ রেস্টুরেন্টে পৌঁছায়। তুমুল বৃষ্টির চোটে আমন্ত্রণ রেস্টুরেন্টের শাটার অর্ধেক বন্ধ রয়েছে দেখে রিসেপশনিস্টের থেকে খোঁজখবর করে জানতে পারে যে, ভিতরে কোনো কাস্টমার নেই আর বাইরে ঝেঁপে বৃষ্টি হচ্ছে বলে ওরা দোকান বন্ধ করে রেখেছে!
শেষ ১৫-২০ মিনিট অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে ভেজার কারণেই হোক বা শতদীপকে খুঁজে না পাওয়ার যন্ত্রণায়; ইতিমধ্যে রুপালির মাথা ধরতে শুরু করেছে। স্টেশনে পৌঁছে প্ল্যাটফর্মের শেডের তলায় কিছুক্ষণ বসে রেস্ট নিয়ে নিলে মাথা ধরাটা খানিকটা হয়তো কমবে; এই আশায় সাইকেল আমন্ত্রণ রেস্টুরেন্টের সামনে রেখে হেঁটে শ্যামনগর স্টেশনে পৌঁছায় ও। কর্ডলাইনে থাকার জন্য এই স্টেশন সাধারণত এক্সপ্রেস ট্রেনের রুট হিসেবেই বেশী ব্যাবহার হয় আর স্টেশনে লোকাল ট্রেনের ডেইলি প্যাসেঞ্জারের ভিড় এমনিতেই কম থাকে; আর এখন বৃষ্টির কারণে স্টেশন প্রায় শুনশান। “৩ নম্বর লাইন দিয়ে থ্রু ট্রেন যাবে; অনুগ্রহ করে নিরাপদ দূরত্বে সরে দাঁড়ান”- মাইকের ঘোষণা শুনতে শুনতে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে শেডের তলায় চোখ বুজে বসে রুপালি।
প্রায় ২ মিনিট এভাবে বসে থাকার পর দূর থেকে হালকা হালকা ট্রেনের সাইরেনের আওয়াজ শুনে চোখ খুলে যায় রুপালির; হঠাথ ওর মাথায় কিছু একটা বুদ্ধি খেলে। দৌড়ে শেডের বাইরে বেরিয়ে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাঁচিল পেরিয়ে ৩ নম্বর লাইনের দিকে দেখার চেষ্টা করে যত দূর অবধি চোখ যায়। প্রায় ২৫ হাত দূরে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা কাউকে লাইনের উপর দিয়ে স্টেশনের উল্টোদিকে হেঁটে যেতে দেখতে পায় ও; আর একটু কষ্ট করে দেখাতে মানুষটার বাঁ হাতে পরে থাকা ফসিলসের ঘড়িটাও চোখ এড়ায় না ওর। রুপালির মনে পড়ে, আগের বছর জন্মদিনে ঠিক একইরকম একটা ঘড়ি ও গিফটপ্যাকে ভরে দিয়েছিলো শত’দা’কে। ইতিমধ্যে ৩ নম্বর লাইনে ১০০ কিমি প্রতি ঘণ্টায় ধেয়ে আসা এক্সপ্রেস ট্রেনের সাইরেনের আওয়াজ তীব্রতর হতে শুরু করেছে; আর কিছু মাথায় না আসাতে গলার সমস্ত জোর লাগিয়ে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাঁচিলের ধার ঘেঁষে ৩ নম্বর লাইনে সামনের দিকে তাকিয়ে রুপালি ডেকে ওঠে, “শত’দাআআআআআআআআআআআ!!!!!!!!!!!!!!!”
পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা পিছন ফিরে তাকায়; হয়তো ওই অবস্থায় রুপালিকে দেখতে পেয়েই একমাথা উসকো-খুসকো চুল আর গালভর্তি দাড়িওয়ালা ছেলেটা একগাল মৃদু হাসি নিয়ে তাকায় রুপালির দিকে; সেটা স্পষ্ট দেখতে পায় রুপালি। ইতিমধ্যে সাইরেন বাজাতে বাজাতে ট্রেন মুখোমুখি ১০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে চলে আসার পরও ছেলেটা লাইনের উপর ট্রেনের দিকে মুখ করেই দাঁড়িয়ে থাকাতে শেষ মুহূর্তে ইঞ্জিনের ড্রাইভার বুঝতে পারে; এ সরবে না! প্রচণ্ড শব্দ করতে করতে একই গতিতে চলে যায় ট্রেনটা। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে লাইনের মাঝখানে চিত হয়ে রক্ত মাখা শরীরটা নিয়ে কুঁকড়ে শুয়ে থাকে শতদীপ।
প্ল্যাটফর্মের উপরে হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয় রুপালি। ওর চিৎকার ঢেকে যায় মেঘের গর্জনে; চোখের জল মিশে যায় বৃষ্টির জলে!!!!
----সমাপ্ত----
No comments:
Post a Comment