****
“কি বে! রাতে নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমাবি বলে দারোয়ানের চাকরি করিস নাকি? লাস্ট ১০ মিনিট ধরে গাড়ীর হর্ন বাজিয়েই চলেছি, কোন স্বপ্নের দুনিয়ায় থাকিস কে জানে? এবার গেট খোল বলছি!!”- উল্টোডাঙ্গার এই কল্পতরু আবাসন পল্লীতে রাতে যে দারোয়ানই ডিউটিতে থাকুক না কেন, গভীর রাতে চোখ লেগে আসার জন্য চৌধুরীবাবুর বকা খায়নি; এমন খুব কম জনই আছে। আর তা হবে না-ই বা কেন; অমিয় চৌধুরী ডাকাবুকো মানুষ, মানিকতলা থানার এস. এইচ. ও.! তা সব দারোয়ানই এই ব্যাপারটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে, এই আবাসন পল্লীতে থাকা সমস্ত মানুষের বাড়ী থেকে বেরোনো আর বাড়ীতে ঢোকার একটা প্যাটার্ন আছে; চৌধুরীবাবুকে বাদ দিয়ে। উনি কখন অফিস বেরবেন আর কখন বাড়ী ফিরে আসবেন, স্বয়ং ভগবানও বোধহয় জানেন না!
যাই হোক, কোনওরকমে চোখ কচলে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকায় দারোয়ানটা, রাত্রি আড়াইটে বাজছে। বেশী কথা না বাড়িয়ে আবাসনের বড় গেটটা খুলে দেয় আর চৌধুরীবাবু গাড়ী নিয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে যাওয়া শুরু করেন।
হঠাথ উপর থেকে খুব ভারী কিছু একটা মাটিতে পড়ার আওয়াজ শুনে গাড়ীর মধ্যে বসেই চমকে ওঠেন অমিয় চৌধুরী। তাড়াতাড়ি গাড়ী থেকে নেমে দারোয়ানটাকে বলে ওঠেন, “এই তুমি শুনতে পেলে, মনে হয় কেউ ছাদ থেকে টি. ভি. বা ফ্রিজ জাতীয় কিছু নীচে ফেলল! আমার মনে হল, ওই চার নম্বর টাওয়ারের পিছনের দিক থেকে আওয়াজটা পেলাম, ঠিক না?”
“হ্যাঁ স্যার! ওদিক থেকেই এসেছে, আমিও স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি!”- দারোয়ানটা জবাব দেয়।
“চল তো গিয়ে দেখি ব্যাপারটা কি!”- চৌধুরীবাবু কথাটা বলার পর উনি আর দারোয়ান ২ জনে হাতে ২ টো টর্চ নিয়ে ৪ নম্বর বিল্ডিঙের পিছনের দিকে রওনা দেয়।
সেখানে পৌঁছে আসল ব্যাপারটা দেখে ২ জনেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। সদ্য তরুণ ছেলেটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে, মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে! নীরবতা ভাঙেন চৌধুরীবাবুই, “আরে এটা ৫ তলায় থাকেন যে রমাদেবী; তার ছেলে অজয় না?”
দারোয়ানটা উত্তর দেয়, “হ্যাঁ স্যার! দেখে তো মনে হচ্ছে অজয়ই!”
“তুমি এক কাজ করো, তাড়াতাড়ি উপরে গিয়ে দেখো ওদের বাড়ীতে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না! ওর মা ঠিক থাকলে ওনাকে শান্তভাবে ব্যাপারটা জানাও, তারপর না হয় ওঁকে বুঝিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসা যাবে। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ফোন কোরো। আমি এখন অজয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, পুলিশ নিজে সঙ্গে থাকলে আশা করা যায় অ্যাডমিট করতে হাঙ্গামা কম হবে!”- কথাটা বলার পর দারোয়ানের সাহায্যে অজয়কে গাড়ীতে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন অমিয় চৌধুরী।
পরদিন সকালে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে কোমায় থাকা ছেলেকে কোনওরকমে চোখের দেখা দেখে বাড়ী ফিরছিলেন রমাদেবী। হঠাথ রাস্তা পার হবার সময় অমিয় চৌধুরী ওঁর পথ আটকান; কেঁদে কেঁদে যে রমাদেবীর চোখগুলো শুকিয়ে গেছে, বেশ বুঝতে পারেন চৌধুরীবাবু। এদিকে উর্দি পরা অবস্থায় প্রথমবার চৌধুরীবাবুকে ওনার পথ আটকাতে দেখে খানিকটা ঘাবড়ে যান রমাদেবীও।
চৌধুরীবাবু বলে ওঠেন, “একই বিল্ডিঙে থাকার দরুন আপনাকে পারসোনালি চিনি বলেই বলছি, এইরকম সময়ে এইসব প্রশ্ন করা খুবই খারাপ ব্যাপার; কিন্তু প্রফেশনাল জায়গা থেকে জিজ্ঞাসা করছি, আপনার ছেলের কি কোনো মানসিক সমস্যা ছিল? হঠাথ এইরকম একটা আউটরেজাস স্টেপ নিতে গেল......!!”
“কি জানি কি যে হয়ে গেল, আমি এখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না! সেই ছোটবেলায় ওর বাবা আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই ও একটু বেশী চাপা স্বভাবের ছিল। তবু শেষ ক’দিনে অন্তত আমার সামনে তো অস্বাভাবিক কোনো আচরণ করতে দেখিনি। গতকাল ওর জন্মদিন ছিল, প্রতিবারের মত এবারেও আমরা ২ জন একসাথে খাওয়াদাওয়া করার পর রাতে রোজকার মতো সাড়ে ১১টার মধ্যে শুতে চলে গিয়েছিল!!”- ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে কথাগুলো বলে ওঠেন রমাদেবী।
উত্তরে চৌধুরীবাবু বললেন, “আপনি যদি কিছু মনে না করেন, অফিসিয়াল ওয়ারেন্ট জেনারেট করার আগে আমি অজয়ের ঘরটা একবার পারসোনালি সার্চ করতে চাইছি! দেখুন, আমি আপনাদের নিচের তলাতেই থাকি; আমার মেয়ে আর আপনার ছেলে একই কো-এড স্কুলে পড়ে; তাই আপনার ছেলেও আমার ছেলের মতই। তাই সেই জায়গা থেকেই প্রতিবেশী হিসেবে আপনার কাছে এই রিকোয়েস্টটা রাখছি, পুলিশ অফিসার হিসেবে নয়!”
****
আজ; প্রায় ৫ বছর পর, হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতায় ফেরার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে উঠেছে অজয়। আই. এস. আই. বনহুগলী থেকে এম. স্ট্যাট. কমপ্লিট করে, পি. এইচ. ডি. করবে ঠিক করে নেওয়ার পর; হঠাথ লন্ডনের এই ফার্মটা থেকে লোভনীয় চাকরি আর তার সাথে পার্মানেন্ট সিটিজেনশিপের অফারটা শুনে আর না করতে পারেনি ও। শেষ ৮ বছর যাবত ও লন্ডনে একাই থাকে; আসার ৬ মাসের মধ্যে মা’কেও এখানে নিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু মা উল্টোডাঙার ফ্ল্যাট খালি ছাড়তে কিংবা ভাড়া দিতে রাজি ছিল না; তাই ওখানেই থাকত। তারপর তো ৫ বছর আগে হঠাথ মায়ের সঙ্গে একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে; ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পা পিছলে গড়িয়ে পড়ে যান উনি। মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ শেষ করে, মনে একরাশ দুঃখ নিয়ে; সেই যে লন্ডনে ফিরেছিল অজয়, মনে মনে ঠিকই করে নিয়েছিল যে, আর কোনোদিন ও কলকাতা ফিরবে না! বিশেষত উল্টোডাঙ্গার কল্পতরু আবাসনপল্লির ৫ তলার ওই ফ্ল্যাটে তো না-ই! বিধাননগরের অলিগলি; বিশেষত ওই ফ্ল্যাটের সাথে মায়ের প্রচুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে; কলকাতায় ফিরে ওইসব চোখের সামনে নতুন করে দেখার পর, স্মৃতির গোছা আঁকড়ে বেঁচে থাকতে একেবারেই রাজি ছিল না ও।
কিন্তু জীবন তো উপরওয়ালার তৈরী করা খাতে চলে; তাই মানুষ মনে মনে কোনো কিছু ঠিক করে নিলেও সে তা-ই করে, যা উপরওয়ালা চায়। ৪ বছর আগে ফেসবুকের কল্যাণে অজয়ের আলাপ হয় দেবীকা চৌধুরীর সঙ্গে; পেশায় মডেল, বেশ কিছু বাংলা সিনেমাতে অভিনয়ও করেছে সে। প্রথম প্রথম প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা ২ জন ফেসবুক ফ্রেন্ড যে ভাবে কথাবার্তা বলে থাকে, অজয় আর দেবীকার মধ্যেও ঠিক সেভাবেই কথা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, একজন অন্যজনের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার প্রবণতা থেকেই হোক; কিংবা কোনো একটা পরিস্থিতিকে একই রকম ভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই হোক, নিজেদের অজান্তেই ওরা মানসিকভাবে ক্রমশ নিজেদের কাছাকাছি আসতে থাকে। প্রায় ১ বছর ফেসবুকে নিজেদের মধ্যে চ্যাট করার পর, ২ জনেই উৎসুক হয়ে পড়ে অন্যজনের গলার আওয়াজ শুনতে।
সেই সময় ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়ার পর্ব শেষ করে ২ জনের সেই যে কথা বলার শুরু, তা এই ৩ বছরেও শেষ হল না; বরং দিনদিন আরও বেড়েই চলেছে। নিজেরা বেশ কিছুটা ঘনিষ্ঠ হবার পরেই অজয় জানতে পারে, দেবীকারাও কল্পতরু আবাসনে ওদের টাওয়ারেই থাকে, ওদের ফ্ল্যাটের ঠিক নিজের তলাতেই দেবীকাদের ফ্ল্যাট।
প্রায় বছরখানেক আগে দেবীকার জন্মদিনে ওকে শুভেচ্ছা জানানোর পর, কথায় কথায় হালকা চালে দেবীকাকে প্রোপোজ করে অজয়! ওর বিশ্বাস ছিল, দেবীকা ওকে ফেরাবে না, আর হয়েছিলও তাই! কিন্তু প্রোপোজাল অ্যাকসেপ্ট করার সময় একটা শর্ত রেখেছিল দেবীকা; যে শর্তটা ছিল- ওর ২৯ বছরের জন্মদিনে কলকাতার তরফ থেকে ও অজয়কে এত সুন্দর একটা মুহূর্ত উপহার দিয়েছে, তার প্রতিদানস্বরূপ আগামী বছর অজয়ের জন্মদিনের সময় ওকে কলকাতায় দেবীকার সাথে দেখা করতে আসতেই হবে।
আজ ১৭ই মে, ২০২০। আর ২ দিন পরেই অজয়ের জন্মদিন, ২৯ থেকে ৩০ বছরে পা দেবে ও-ও! মা ওকে ছেড়ে চলে যাবার পর, এই প্রথম কলকাতার বুকে অপেক্ষায় থাকা সমবয়সী মডেল বান্ধবীর আবদারে লন্ডন থেকে উল্টোডাঙ্গায় নিজের ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হয় ও; যাকে কি-না ও ভবিষ্যতের লাইফ পার্টনার হিসেবে দেখা শুরু করেছে।
জন্মদিনের সন্ধ্যাবেলায় রাত ৮টা নাগাদ ফ্ল্যাটের কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজাটা খোলে অজয়; ৪ বছর ধরে ডিজিটাল দুনিয়ায় থাকা, নিচের ফ্ল্যাটের মেয়েটাকে; প্রথমবার রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে চোখের সামনে দেখতে পায়! ফর্মালি হাগ করার পর দেবীকা প্রথম প্রশ্নটা করে অজয়কে, “সে কি! জন্মদিনে বাড়ী এত সুন্দর করে সাজিয়েছো, সে না হয় বুঝলাম; কিন্তু আমাকে ছাড়া আর কাউকে ইনভাইটও করোনি? অন্তত কাছের বন্ধুদের তো ডাকতে পারতে!”
“কাছের বন্ধুদের রিকোয়েস্টে তো আমি এখানে আসিনি, যার জন্য এসেছি স্পেশাল দিনটা শুধু তার প্রতিই না হয় ডেডিকেটেড থাকুক!”- অজয়ের কথা শুনে খুব শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরে দেবীকা।
“সত্যি বলছি, আমি জীবনে ভাবতে পারিনি আমার মা-বাবা ছাড়া কেউ আমাকে এতটা ভালবাসতে পারে!”- কথাটা বলার পর দেবীকা একটা গভীর চুম্বন এঁকে দেয় অজয়ের ঠোঁটে।
একসাথে কেক কাটা, একই চেয়ারে বসে এক ডিশ থেকে ২ জনে মিলে ডিনার খাওয়া, প্রচুর আড্ডা আর তার সাথে প্রচুর আদর..... ৪ বছরের অপেক্ষার পর প্রথমবার নিজেদেরকে এতটা কাছাকাছি পাবার অনুভূতিতে সময় যে কিভাবে পেরিয়ে গেছে, ২ জনের ১ জনও বুঝতে পারেনি। হঠাথ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সম্বিৎ ফেরে অজয়ের; রাত প্রায় ২ টো ২০ বাজছে!
“দেখলে তো, এত রাত হয়ে গেল; বুঝতেই পারিনি! দিনের বেলা চলে আসতে পারতে, পুরো দিনটা একসাথে কাটানো যেত!”- খানিক বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে অজয়।
দেবীকা বলে, “আরে! বাবাকে ম্যানেজ দিয়ে আসা কি অত সোজা নাকি? ধরে ফেললে কেস জন্ডিস হয়ে যাবে!”
অজয় বলল, “আরে! তোমার বাবা পুলিশ ছিল; এখন তো রিটায়ার করে গেছে। আর সে যদি জানতে পারে যে তার মেয়ে একজন এম. স্ট্যাট. করা এন. আর. আই. ছেলের সাথে প্রেম করছে, সন্দেহ করার বদলে তোমাকে নিয়ে ধন্য ধন্য করবে!”
দেবীকা বলল, “সেটা তুমি ভুল বলোনি। তবে জানো কিনা, আমার মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছা করে; তুমি আমার জন্য ঠিক কতটা এক্সটেন্ট অবধি যেতে পারো! জানি, জাস্ট আমি বলেছি বলেই ৫ বছরে প্রথমবার এতদূর থেকে কলকাতা ফিরেছো, তা-ও শুধু আমার একার সঙ্গে বার্থডে সেলিব্রেট করার জন্য! তবু কেন জানি না তোমার ভালোবাসার ডেনসিটি মাপতে ইচ্ছা করছে। যদি স্যাটিসফাই করতে পারো, তাহলে কাল তুমি চলে যাবার আগেই বাবাকে আমাদের ব্যাপারে জানিয়ে দেবো!”
অজয় বলল, “এতকিছু করলাম যখন, আরও একটা কাজ না হয় করেই ফেলব। বলো তাহলে, তোমার কাছে নিজের ভালোবাসার ডেনসিটি প্রুভ করার জন্য ঠিক কি করতে হবে?”
দেবীকা বলল, “এখানে নয়; ছাদে চল!”
২ জনে বিল্ডিঙের ছাদে পৌঁছনোর পর দেবীকা অজয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে ওর চোখে কালো কাপড় বেঁধে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে চোখ বাঁধা অবস্থাতেই সিকিউরিটি রেলিং পেরিয়ে অজয়কে ছাদের একদম ধারে নিয়ে যায়।
অজয়কে ওখানে দাঁড় করিয়ে রেখে, নিজে ছাদে নিরাপদ জায়গায় ফিরে আসে দেবীকা। সেখানে দাঁড়িয়ে অজয়ের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, “তোমাকে আমি ছাদের ধারে দাঁড় করিয়ে রেখেছি অজয়! যদি এখুনি আমি তোমাকে নিচে ঝাঁপ দিতে বলি, পারবে তুমি আমার কথা ভেবে এই কাজটা করতে?”
অজয় কিছুক্ষণ আগে বলা কথাটা ফের আউড়াতে থাকে, “শুধু তুমি চেয়েছো বলে এতকিছু করলাম যখন, এ আর এমন কি!”- কথাটা বলতে বলতেই দেবীকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপ দেয়।
****
মানিকতলা থানায় পৌঁছনোর পর; থানার বাইরের বেঞ্চে বসে চৌধুরীবাবুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন রমাদেবী। ৩ দিন হল তাঁর ছেলে মারা গেছে, রাত্রে ওইরকম রহস্যজনক ভাবে ছাদ থেকে পড়ে যাবার পর প্রায় ১ সপ্তাহ হাসপাতালে কোমায় ছিল অজয়। শেষ পর্যন্ত ৩ দিন আগে সে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। আজ চৌধুরীবাবুই রমাদেবীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, ছেলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আর তদন্তের সময় অজয়ের ব্যাপারে পুলিশের হাতে আসা অন্য বেশ কিছু অসংলগ্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে।
“ম্যাডাম, আপনার মনের ব্যাপারটা আমি কিছুটা হলেও বুঝি; আমারও তো আপনার ছেলের সমবয়সী একটি মেয়ে আছে, সে ও ক্লাস নাইনেই পড়ে, একই স্কুলে! তবু আপনার ছেলের সংক্রান্ত কিছু ব্যাপারে আমরা বেশ কিছু অসংগতি পেয়েছি; যদি কিছু মনে না করেন, আপনাকে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?”- আনমনা হয়ে বসে ছিলেন রমাদেবী; হঠাথ অমিয় চৌধুরী কথাগুলো বলাতে হুঁশ ফেরে তার।
তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন অমিয়বাবুকে, “চলুন!”
রমাদেবীকে নিজের কেবিনে বসিয়ে বলা শুরু করেন চৌধুরীবাবু, “যখন প্রথমবার অজয়কে নিচ থেকে উদ্ধার করে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাই, ওর চোখে একটা কালো কাপড় বাঁধা ছিল। আর আমাদের তদন্ত অনুযায়ী, সেদিন রাতে ৪ নম্বর টাওয়ারের ছাদে অজয় ছাড়া আর কেউ ছিল না! তাহলে ওর চোখে কাপড়টা বাঁধল কে? ঘরে কি কখনো এরকম চোখে কাপড় বেঁধে ঘুরে বেড়াতো?”
রমাদেবী ঘাড় নেড়ে না করতে করতে ব্যাপারটা অস্বীকার করেন।
চৌধুরীবাবু বলে চলেন, “যদিও কম মাত্রায়, তবু ব্যাপারটা অস্বাভাবিক বলেই বলছি; পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আপনার ছেলের রক্তে ফ্লুভক্সামিন পাওয়া গেছে। মনে হয় ঘটনা ঘটার ১ থেকে ২ ঘণ্টা আগেই ও এটা কনসিউম করেছিল। এটা বিদেশে মোস্টলি ইন্সোমনিয়াক লোকেরা কনসিউম করে থাকে আর ইন্ডিয়াতে এই ড্রাগ নেওয়া কিন্তু ইললিগাল; আপনি কি জানেন ঠিক কি ভাবে ও এত ছোটো বয়সে এই ড্রাগের অ্যাকসেস পেয়েছিলো?”
রমাদেবী কোনওরকমে চোখের জল আড়াল করে বলেন, “বিশ্বাস করুন স্যার; এইসব ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না!”
চৌধুরীবাবু ফের বলে ওঠেন, “সর্বোপরি, অজয়ের ঘরে ওর ডায়েরির ভিতরে লেখা ওর এই সুইসাইড নোট; যেখানে ও নিজের প্রাণ দিয়ে দেওয়ার জন্য একজন মেয়েকে ভালোবাসার পাত্রী হিসেবে না পাওয়াকে আত্মহত্যা করার কারণ হিসেবে দাবি করেছে! আপনি যখন আমাকে পারসোনালি ওর রুমটা সার্চ করার অনুমতি দিয়েছিলেন, তখনই আমি এটা পেয়েছিলাম; তদন্তের স্বার্থে এতদিন আপনাকে জানাইনি। কিন্তু এই সুইসাইড নোটটার ২ টো ব্যাপার ভীষণ কনফিউসিং! প্রথমত, এখানে ও মেয়েটার ব্যাপারে অনেক কিছু বললেও কোথাও মেয়েটার নাম মেনশন করেনি; কিন্তু কেন? মেয়েটার নাম জানতে পারলে হয়তো আমরা অজয়ের সমস্যাটা আরও একটু ডিটেইলসে জানতে পারতাম! দ্বিতীয়ত, সুইসাইড নোটের নিচে নিজে সাইন করার পর ও ডেট মেনশন করেছে; মনে হয় সাইন করার পর ডেট মেনশন করা ওর স্বভাব। কিন্তু এখানে যে ডেটটা ও লিখেছে, সেটা হল ১৭/৫/২০০৫; আর যেদিন ঘটনাটা ঘটেছিল, সেদিন ছিল ২০শে মে। তো এখানে কি ও ভুল করে ৩ দিন আগের ডেট লিখে ফেলেছে নাকি সুইসাইড নোট লেখার ৩ দিন পর ও অ্যাকচুয়ালি সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে ও ৩ দিন অপেক্ষা করেছিলো কেন? অনেক ভেবেও আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর উদ্ধার করতে পারছি না; আপনি কি এর একটা ব্যাপারেও কিছু জানেন?”
অনেকক্ষণ ধরে কান্না চেপে রেখেছিলেন রমাদেবী; কিন্তু এইসব শোনার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠেন, “বিশ্বাস করুন অমিয়বাবু, আমার এবার সত্যিই মনে হচ্ছে; আমি আমার ছেলেকে যেভাবে মানুষ করেছি, তাতে নিশ্চয়ই কোনো খামতি রয়ে গিয়েছিলো। হয়তো ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হতো না; কিন্তু রেজাল্টও তো অত খারাপ করতো না! তাছাড়া বড্ড বেশী চাপা স্বভাবের ছিল; আমিও কোনোদিন ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ওকে ঘাঁটানোর চেষ্টা করিনি। তাই বলে এতকিছু করে ফেলবে, আর এইসবের ব্যাপারে ওর মৃত্যুর পর জানতে পারবো; আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারিনি!!”
চৌধুরীবাবু পুলিশের চোখ দিয়ে রমাদেবীর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন ভদ্রমহিলা সত্যিই কিছু জানেন না, আর ছেলের মৃত্যুর আকস্মিকতা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেননি! উনি কনস্টেবলকে ডেকে এনে পুলিশের গাড়ীতে রমাদেবীকে বাড়ী ছেড়ে আসতে বলেন; কিন্তু রমাদেবীকে করা ওর প্রশ্নগুলোর উত্তর অজানা থাকায় নিজেও খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েন।
****
আজ ১৭ই মে, ২০০৫। দেবীকা চৌধুরীর সঙ্গে ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু হওয়া অজয় সান্যালের ৪ বছরের বন্ধুত্বের আজ ‘দি এন্ড’ হয়ে গেছে। ২ জনে খুব ছোটোবেলা থেকে একসাথে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছে। ২ জনের একজন ৫ তলায় আর অন্যজন একই বিল্ডিঙের ৪ তলায় থাকার দরুন স্কুল হোক, বা কোচিং সেন্টার কিংবা মাঠে খেলতে যাওয়া; প্রায় সবকিছুই একসাথে করেছে। নিজেদের হোম ওয়ার্ক থেকে শুরু করে টিফিন পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই শেয়ার করা, গল্প করা, নিজেদের মধ্যে করা ছোটো ছোটো খুনসুটি.... সবকিছু মিলিয়ে বন্ধুত্বটা জম্পেশ চলছিল।
বাধ সাধলো ক্লাস এইটে ওঠার পর অজয়ের দেবীকার প্রতি তৈরী হওয়া দুর্বলতা! স্কুল থেকে শুরু করে কোচিং সেন্টার অবধি সব জায়গাতেই ও দেবীকার পিছন পিছন যেতে থাকলো! এমনকি যেখানে অজয়ের কোচিং নেই কিন্তু দেবীকার কোচিং আছে, সেখানেও ও দেবীকার পিছু পিছু গিয়ে ওকে পাহারা দিতে শুরু করলো। এদিকে সারাক্ষণ দেবীকাকে নিয়ে চিন্তা করতে থাকায় ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষায় অজয়ের রেজাল্ট খুবই খারাপ হল, ফেল না করলেও ওকে স্কুল থেকে স্পেশাল কনসিডারেশনে পাশ করিয়ে ক্লাস নাইনে ওঠানো হল। অজয়ের মা রমাদেবী অনেক চেষ্টা করেছিলেন অজয়ের থেকে এই খারাপ রেজাল্টের কারণ জানতে; কিন্তু চাপা স্বভাবের ছেলের মুখ থেকে একটা কথাও বের করতে পারেননি।
দেবীকাও অজয়ের হঠাথ করে শুরু হওয়া এই অতিরিক্ত আগলে রাখার প্রবণতাটাকে একেবারেই খারাপভাবে নেয়নি; বরং মা-বাবা ছাড়া কেউ প্রথমবার ওকে এতটা অ্যাটেনশন দিচ্ছে এটা ভেবেই মনে মনে বেশ খুশী হত ও! অজয়ের মনের কথা না জানলেও; ওর দিক থেকে আসা এই অতিরিক্ত অ্যাটেনশন বা আগলে রাখার প্রবণতা যে ওর খুব ভালো লাগতো, সেটা বন্ধু হিসেবেই দেবীকা মাঝেমধ্যে জানাতো অজয়কে।
শেষ একমাস ধরে দেবীকার কথা চিন্তা করতে করতে রাতের ঘুম উড়তে বসেছে অজয়ের। শুধু পড়াশোনাই নয়, এমনকি ক্রিকেট খেলা; যে কাজটা করতে ও সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে, সেই ক্রিকেটের মাঠেও আর মন দিতে পারছে না ও! সারারাত উল্লুকের মত জেগে থাকে আর সারাদিন চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু থাকে; কোনো কাজেই মন বসতে চায় না!
অনেক চিন্তাভাবনা করার পর অজয় ঠিক করেছিলো আজ দেবীকাকে ওর মনের কথা জানাবে। যেই ভাবা সেই কাজ! সকালে দেবীকার সামনে নিজের মনের কথাটা পাড়ার সময়ও অজয় ভাবতে পারেনি যে ওর কথা শুনে দেবীকা এইভাবে রিঅ্যাক্ট করবে। ওর প্রোপোজালে ডিরেক্ট না করে দিলেও না হয় একটা ব্যাপার ছিল, কিন্তু ওদের রিলেশনের ব্যাপারে অজয়ের দিক থেকে রাখা প্রতিটা পজিটিভ পয়েন্টের উত্তরে একটা নেগেটিভ যুক্তি খাড়া করে দেবীকা অজয়কে রীতিমত বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, ও দেবীকার ভালোবাসার যোগ্যই নয়।
যখন অজয় বলেছে, “সেই ছোটবেলা থেকে তোর অঙ্কের হোম ওয়ার্ক আমি করে দিচ্ছি আর তুই আমার ইংলিশের হোম ওয়ার্ক করে দিচ্ছিস! দেখিস আমরা ২ জন একসাথে থাকলে সারাজীবন এইভাবেই নিজেদের সাহায্য করতে থাকবো!”; তার উত্তরে দেবীকা বলেছে, “তো! ক্লাস নাইনের অঙ্ক করে দিয়ে নিজেকে খুব বড় হনু ভাবছিস নাকি? আমি যাকে ভালবাসবো, তার আই. এস. আই. থেকে স্ট্যাটিস্টিক্সের ডিগ্রি থাকবে আর সে বিদেশে কোনো কোম্পানিতে কাজ করবে বুঝলি? তুই তো ঠিক করে ইংলিশও বলতে পারিস না; তুই কি বুঝবি বিদেশে চাকরির মাহাত্ম্য; ছাড় বাদ দে!”
এরপর যখন অজয় বলেছে, “তোকে আমার দেখতে বড্ড সুন্দর লাগে; আর যদি মন দিয়ে দেখিস, আমার গায়ের রং তোর থেকে খানিকটা চাপা হলেও আমি কিন্তু দেখতে মোটের উপর ভালোই; আমাদেরকে একসঙ্গে দারুণ মানাবে; কি বলিস?” ; তার উত্তরে দেবীকা বলেছে, “ভাই, আমার বাবার নাম অমিয় চৌধুরী; উনি পূর্ব কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত একটা থানায় হাই পোস্টে কর্মরত! কথাগুলো বলার আগে নিজের ফ্যামিলি হিস্ট্রির দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছিস? আমি বড় হয়ে সিনেমার হিরোইন হতে চাই; নাহলে কম সে কম মডেল! তো আমাকে যে ভালবাসবে, তাকে টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম হতে হবে; তোর মত বাঁদরমুখো নয়!”
সবশেষে যখন অজয় বলেছে, “আমি তোকে খুব কম করে হলেও ঠিক ততটাই ভালবাসবো, যতটা তোর বাবা-মা তোকে ভালোবাসে”; তার উত্তরে দেবীকা বলেছে, “এইসব ভুলভাল কথা বলা বন্ধ কর; বাবা-মায়ের থেকে বেশী কেউ আমাকে ভালবাসতে পারে, এটা আমি বিশ্বাস করি না!”
এই ঘটনার পর দেবীকার সঙ্গে অজয়ের যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা ছিল, সেটাও আর নেই বললেই চলে। দিনের বেলা দেবীকার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ী চলে আসলেও রাত যত বাড়তে থাকে, অজয় দেবীকাকে আরও বেশী মিস করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ও আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, সুইসাইড নোটে আত্মহত্যার সমস্ত কারণগুলো খুব ডিটেলসে লিখলেও কোথাও দেবীকার নাম উল্লেখ করে না ও। সুইসাইড নোটটা পকেটে নিয়েই মা ঘুমিয়ে পড়ার পর সবার চোখের আড়ালে আস্তে আস্তে ছাদে পৌঁছে নিচে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করে ও; কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না। বার বার মায়ের কথা মনে পড়তে থাকে ওর, আর ঠিক ২ দিন পর ওর জন্মদিনও আসছে; এই সময় এই ধরণের একটা সিদ্ধান্ত নিলে মায়ের অবস্থা কি হবে, সেটা ভেবেই আপাতত নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে অজয়। ফের বাড়ী ফিরে সুইসাইড নোটটা ওর ডায়েরির ভিতরে ঢুকিয়ে রাখে ও।
মায়ের কথা ভেবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও, শেষ ২ দিন ধরে দেবীকার সঙ্গে কথা বলতে না পেরে; জীবন রীতিমত দুর্বিষহ লাগা শুরু হয় অজয়ের। অনেক ভেবেচিন্তে কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে; জন্মদিনের দিন সকালে মা যখন ওকে পায়েস বানানোর জন্য আতপচাল কিনতে পাঠিয়েছিলো, তখন বাড়ী থেকে বেরিয়ে ও সোজা এসে উপস্থিত হয় ভোলা মস্তানের দেশী মদের ঠেকে। ভোলা মস্তানের ভালো নাম সায়ক; ক্লাস ফাইভ অবধি সে অজয়দের সাথেই পড়াশোনা করেছে। যে ক’বছর এক ক্লাসে পড়তো, পরীক্ষার সময় সায়ক পুরোটাই অজয়ের থেকে টুকেই যতটুকু যা লিখতো; শেষ পর্যন্ত ক্লাস ফাইভে ৪ বার ফেল করার পর সায়ক বুঝে যায়, পড়াশোনা ওর দ্বারা হবে না; তো ছোটোখাটো চুরি-চামারি, পকেটমারি থেকে শুরু করে ডাকাতি, খুন সব খারাপ কাজে পারদর্শী হবার পর শেষ ৪ বছরে ও সায়ক থেকে হয়ে ওঠে ভোলা মস্তান।
যেহেতু সায়ক পরীক্ষার খাতায় সবকিছুই অজয়ের থেকে টুকে লিখত, ওর মধ্যে অজয়ের জন্য বন্ধু হিসাবে কিছুটা হলেও দুর্বলতা ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই অজয় দেবীকার ব্যাপারে যে অনুভূতিগুলোর কথা নিজের মা’কে কোনোদিন জানাতে পারেনি, সেই পুরো ব্যাপারটাই জানায় ভোলা মস্তান ওরফে সায়ককে; আর এই পরিস্থিতিতে ওর কি করা উচিৎ সেই ব্যাপারে সায়কের থেকে সাহায্য চায়।
“বাঁড়া; তোর জায়গায় আমি থাকলে তো আমাকে না করার পরই, ল্যাওড়া ওই মেয়ের মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারতাম! কিন্তু তুই তো ল্যাওড়া ভালো ছেলে, বড় স্কুলে পড়িস। এইসব করলে তোর নাম, ক্যারিয়ার সব চুদে যাবে! তার চেয়ে এক কাজ কর, ওই পুলিশ অফিসারের মেয়েকে কিছু করার দরকার নেই! ওই মেয়ের জন্য তোর রাতের ঘুম উবে গেছে তো; এই ওষুধ ২ টো নিয়ে যা, রাতে শুতে যাবার আগে জলে গুলে খেয়ে নিস.... মাইরি বলছি, জন্নত দেখতে পাবি ভাই; জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে পারবি। আর স্বপ্নের দুনিয়ায় ওই মেয়ের সঙ্গে যা খুশী তাই করতে পারবি; কেউ কিচ্ছু বলার থাকবে না! যদি খেয়ে কাজ হয়, আবার আসিস, আবার দিয়ে দেব....তবে হ্যাঁ; লুকিয়ে নিয়ে যাস কিন্তু ভাই; নাহলে তুই আর আমি ২ জনেই ফেঁসে যাবো!”- অজয়ের সমস্যার কথা শুনে ভোলা মস্তান এই সমাধান দেয়।
হাতে লুভক্সের প্যাকেটটা নিয়ে অজয় প্রশ্ন করে সায়ক ওরফে ভোলা মস্তানকে, “এইগুলো কি ঘুমের ওষুধ রে?”
“ভাই তুই ভালো ছেলে; ফল খা.... গাছের নাম জেনে তোর কাজ নেই! চল দেখি এবার কেটে পড়; আমায় অন্য কাজে যেতে হবে”- অজয়কে কথাগুলো বলার পর ভোলা মস্তান সেখান থেকে বিদায় নেয়।
বাড়ী ফেরার পর জন্মদিনের সারাটা দিন অজয় মায়ের সঙ্গে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে; ওর মধ্যে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সে ব্যাপারে মা’কে কিছু বুঝতে দেয় না। শেষ পর্যন্ত রাতে ঘুমোতে আসার পর ওর মন অস্বাভাবিক রকমের খারাপ লাগা শুরু করে; এই প্রথমবার ওর জন্মদিনে দেবীকা ওকে উইশ করেনি......ঘুমনোর অনেক চেষ্টা করলেও এই ধরণের চিন্তাগুলো ওকে কোনোমতেই ঘুমোতে দেয় না! শেষে আর উপায় না পেয়ে রাত দেড়টা নাগাদ সায়কের দেওয়া লুভক্সের ২ টো ট্যাবলেট জলে গুলে খেয়ে নেয় ও!
খাওয়ার পরেই, ড্রাগের নেশায় আর স্বপ্নের দুনিয়ায়, দেবীকার যা পছন্দ; সেই আই. এস. আই. বনহুগলীর স্ট্যাটিস্টিক্স ডিপার্টমেন্টের অ্যালুমনি হয়ে যায় ও; দেবীকার পছন্দ অনুযায়ীই স্বপ্নের দুনিয়ায় লন্ডনে একটা চাকরি পায়; ফেসবুকের দুনিয়ায় দেবীকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার পর জন্মদিনের সন্ধেটা ওর সঙ্গেই কাটায়...... শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের দুনিয়ায় থাকা দেবীকার কথামতো নিজের ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে গিয়ে গভীর রাতে একা একাই ছাদে উঠে নিজেই নিজের চোখে কালো কাপড় বেঁধে ছাদের ধার থেকে নিচে ঝাঁপ দেয়!!
------------সমাপ্ত------------
No comments:
Post a Comment